Sunday, March 31, 2024

মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে, আমি অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম৷ আমার উচিৎ ছিল কল দিয়ে নিজের টিমের সাহায্য কামনা করা। কিন্তু হাত পা কেমন অবসের মতো হয়ে গেছে তাই তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করতে পারিনি।

তাইশা আবার বললো,
- আপনি পুলিশের ইনফর্মার হিসেবে কাজ করেন তাই না? নাকি অন্য কোন পদবি?
আমি বললাম,
- আমার সঙ্গে এরকম করার ফলাফল কিন্তু ভালো হবে না তাইশা।
- তো কি করবো? আপনি আমাকে ধরার জন্য ফাঁদ পেতে বসে থাকবেন। আর আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে সবকিছু জেনেও ফাঁদে পা দেবো। এটা ভাবলেন কীভাবে?
- অন্যায় করে কেউ বাঁচতে পারে না।
- মরে গেলে তখন দেখা যাবে। আমি জীবিত অবস্থায় নিজেকে বিড়াল বানাতে চাই না। মরার পরে আমার সম্পর্কে মানুষ কে কি বলে এসবে আমার কোনো চিন্তা নেই।
বললাম,
- নিয়াজ হাসানকে কেন মেরেছেন?
- পা!পের শা!স্তি দিতে।
- আর আপনার স্বামীকে? তাকে কেন মারলেন?
- তাকে আমি মারিনি, সে সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।
আমি আর কিছু বলতে পারছিলাম না। শরীরের মধ্যে তখন যন্ত্রণার কাতরানি। হঠাৎ করে দেখি তাইশার কাছে আরেকটা মানুষ এসেছে। সেই লোকটা এসেই বললো,
- আমি ভালো করে জানি লোকটা একা এখানে আসেনি। নিশ্চয়ই তাকে সাপোর্ট করার জন্য বিল্ডিংয়ের আশেপাশেই পুলিশের টিম আছে। তাই তারা আসার আগেই আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে।
তাইশা বললো,
- কিন্তু যদি না মরে তখন?
- মরবে না কেন? আধ ঘন্টার মধ্যে ফিনিশ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা শুধু শুধু রিস্ক নিয়ে কেন থাকবো এখানে?
- আচ্ছা চলো তাহলে।
জানালার সামনে থেকে তারা চলে গেলেন। মৃদু আলো ছাড়া আর কিছু নেই সেখানে। কতক্ষণ জ্ঞান ছিল জানি না। তবে দরজায় জোরে ধাক্কা আর আমার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ কানে শুনতে পেয়েছিলাম।


ডাক্তার সাহেব কেবিনে প্রবেশ করলো। সবার দিকে তাকিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
- অনেকটা সময় আপনাদের দেওয়া হয়েছে। এখন প্লিজ সবাই বাইরে যান। এরকম কন্ডিশনে এতো কথা বললে শ্বাসকষ্ট বাড়বে। অবস্থা আরো খারাপ হতে পারে।
ওসি সাহেব ও এসআই ফরিদ কেবিন থেকে বের হয়ে বাইরে এলো৷ ওসি সাহেব বললেন,
- তুমি আরেকটু দেরি করে গেলে হয়তো রুদ্রকে বাঁচানো কষ্ট হয়ে যেত।
- স্যার ঝামেলা হচ্ছিল ছাদের দরজার খুলতে গিয়ে। আমরা বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে যখন সবাই মিলে উপরে যাচ্ছিলাম তখন গিয়ে দেখি ছাদের দরজা ছাদ থেকে বন্ধ করা।
- তারমানে বাড়ির মালিক বা তার মেয়ে ছাদে উঠে দরজা বন্ধ করে তারপর রুদ্রর উপর আক্রমণ করেছে।
- এখানে একটা কথা আছে স্যার।
- কি কথা?
- আমরা ছাদের উপর কাউকে দেখতে পাইনি। রুদ্রর কথা অনুযায়ী ছাদে দুজন ব্যক্তি ছিল তাদের মধ্যে একজন মহিলা ও একজন পুরুষ। আমরা যেহেতু দরজা ভেঙে প্রবেশ করেছি তাহলে ছাদের সেই দুজন কোথায়?
- তোমরা কি ভালো করে খোঁজ করেছ?
- জ্বি স্যার করেছি। কারণ দরজা যখন বন্ধ ছিল তখনই সন্দেহ হচ্ছিল। তাই ছাঁদে গিয়ে আমরা চারিদিকে খুঁজে দেখেছি।
- উপরে পানির যে ট্যাংক থাকে সেখানে দেখেছ?
- ভিতরে তো দেখিনি স্যার, তাছাড়া বৃষ্টিতে ছাদ খানিকটা পিচ্ছিল ছিল। আমাদের একজন আহত হয়েছে পড়ে গিয়ে।
- আচ্ছা শোনো, আপাতত রুদ্রকে পাঠিয়ে এটুকু তো নিশ্চিত হওয়া গেছে যে নিয়াজ হাসানকে হত্যা করা হয়েছে। মামলা আরও ভালো করে তৈরি করো, আর নিয়াজের বড়বোনকে বলবে নিয়াজ সম্পর্কে ও বাড়িতে থাকা অবস্থায় আর কি কি হয়েছে সেগুলো যেন জানায়।
- ঠিক আছে স্যার।
- আমি ওই বাড়িতে যাচ্ছি। বাড়ির মালিক ও তার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে। পালিয়ে গেছে নাকি তা বা কে জানে? রাতে ছাদ থেকে জ্বলজ্যান্ত মানুষ দুটো কোথায় গেল সেটাই বুঝতে পারছি না।
- স্যার আমরা যদি আগে থেকে জানতাম এসব বাড়ির মালিক ও তার মেয়ে মিলে করতেছে তাহলে তো রাতেই বাড়ি আটক করতাম।
- সেটাই তো সমস্যা, রুদ্রর কাছে না শুনে তো কিছু করা যেত না। আচ্ছা সাজু কোথায়?
- সাজু ভাই তো উত্তরায়, ওখানে একটা বাসায় এক ভাড়াটিয়ার শালি খুন হয়েছে। সেখানেই তিনি আছেন, সম্ভবত আসামি ধরা পড়েছে।
- সাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করো৷ ডিবি অফিসে কথা বলে দেখো সাজুকে পাওয়া যায় নাকি।
- মনে হয় পাওয়া যাবে না স্যার।
- কেন?
- শুনেছি কি একটা বিষয় নিয়ে সাজু ভাইয়ের সঙ্গে উপরমহলের কার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। সাজু ভাই এই মামলা শেষ হলে চাকরি ছেড়ে দিবেন শুনলাম।
- কি বলো এসব? আচ্ছা তবুও চেষ্টা করো, যদি পাওয়া যায়।
- ওকে স্যার।
বাড়ির দারোয়ান চুপচাপ বসে আছে গেইটের সামনে। রাস্তায় একটা রিকশা এসে থামলো। রিকশা থেকে নামলো তামান্না, ব্যাগ থেকে ৫০ টাকা বের করে রিকশা ভাড়া দিয়ে গেইটের সামনে এসে দাঁড়ালো৷
দারোয়ান গেইট খুলতে খুলতে তামান্নার দিকে তাকিয়ে বললো।
- আপা গতকাল রাতে বাড়িতে পুলিশ এসেছিল।
তামান্না অবাক হয়ে গেল, এ বাড়িতে পুলিশ কেন আসবে বুঝতে পারলো না৷ তাছাড়া দারোয়ান এমনভাবে পুলিশ আসার কথা বর্ননা করছে যেন পুলিশ কোনো শুভ কাজে এসেছে।
তামান্না বললো,
- পুলিশ এসেছে কেন? কি হয়েছে?
- ছাদের রুমে সপ্তাহ খানিক আগে যে ছেলেটা এসেছিল তাকে ধরতে আসছিল। শালায় মনে হয় সন্ত্রাসী হবে, পুলিশ তো তাকে এমন মাইর দিছে যে একদম অজ্ঞান হয়ে গেছে।
- কীভাবে বুঝলেন? আপনি কি গেইট পাহারা বাদ দিয়ে ছাদে আসামি ধরা দেখতে গিয়েছেন?
- না না, দেখলাম পুলিশ ওই শালারপুতকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। তখনই বুঝেছিলাম।
- ঠিক আছে।
তামান্না বেশ চিন্তিত হয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলো। নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে দিল তামান্নার মামা।
তামান্না বললো,
- রাতে নাকি পুলিশ এসেছিল মামা?
- হ্যাঁ আমিও শুনলাম, কিন্তু রাতে কিছু জানতাম না আমি। সকাল বেলা উঠে হাঁটতে বের হবার সময় দারোয়ানের কাছে শুনলাম।
- আমার তো সন্দেহ হচ্ছে মামা।
- কেন কি হয়েছে?
- পুলিশ আবার আমার বিষয় কিছু জানতে পেরেছে নাকি?
- তা কি করে সম্ভব?
- মামা তুমি তো জানো আফরিন নামের ওই মেয়ে হ!ত্যার মামলায় সাজু নামক একজন তদন্তের দায়িত্বে আছে। সেই লোক মাত্র তিনদিনের মধ্যে শাহানা আর আমার বিষয় বের করে ফেলেছে।
তামান্নার মোবাইল বেজে ওঠে, তামান্না মোবাইলে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ বড় বড় করে মামার দিকে তাকিয়ে রইল।
মামা বললো,
- কে কল করেছে?
- অপরিচিত নাম্বার।
- রিসিভ কর।
- কিন্তু আমার এই নাম্বারে তো কেউ জানে না।
- তাহলে কল কেটে দিয়ে মোবাইল বন্ধ কর।
[ " বিশ্বাস অবিশ্বাস " গল্পের সঙ্গে এই গল্পের সম্পুর্ন মিল আছে। তাই যারা নতুন পাঠক পাঠিকা তারা পেইজে পিন পোস্টে চেক করে গল্পটা আগে পড়বেন। ]
★★
দুজন কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে ওসি সাহেব তাইশার বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হলেন। দারোয়ান আলমগীর গেইট ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ওসি সাহেব বললেন,
- বাড়ির মালিক বাসায় আছে?
আলমগীর বললো,
- না স্যার।
- কোথায় গেছে?
- বড় সাহেব তো রাতে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে গেছে তাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।
- কোন হাসপাতালে?
- তা তো জানি না, গতকাল রাতে আফামনি তাকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে।
- গতকাল রাতে মানে? রাত কয়টার দিকে?
- তখন তো ঘড়ি দেখিনি, তবে বৃষ্টি নামার আগে। রাতে যখন বৃষ্টি নামছে তার একটু আগে।
- তুমি ঠিক বলছো তো? রাতে বৃষ্টি কমার পরে তাইশা বা তার বাবা কেউ বাসায় ছিল না?
- সত্যি বলছি স্যার, বড়সাহেবকে নিয়ে রাতে হাসপাতালে যাবার পরে আফামনির এখনো বাসায় আসে নাই।
ওসি সাহেব এবার যেন সমুদ্রের মধ্যে পড়ে গেল। রুদ্রর কাছ থেকে আসার সময় পথে বসে বসে তাইশা ও তার বাবাকে জিজ্ঞেস করার জন্য যে প্রশ্ন সাজিয়েছেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। ওসি সাহেব বিড়বিড় করে বললেন,
" তাইশা যদি তার বাবাকে নিয়ে রাত বাড়িতেই না থাকে তাহলে রুদ্রর সঙ্গে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কে কথা বলেছে? যে দুজন মিলে রাতের আঁধারে ছাদে ছিল তারা কোথায়? "
- ওইতো মনে হয় আফামনির গাড়ি আসছে।
সাদা রঙের একটা গাড়ি রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ালো। আলমগীর দারোয়ান গেইট সরিয়ে দিল। গাড়িটা ভিতরে প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে একটা মেয়ে নামলো। ওসি সাহেব বুঝলেন যে এটাই তাইশা। ওসি সাহেব সামনে এগিয়ে গেল।
তাইশার দিকে তাকিয়ে বললেন,
- আপনার বাবা এখন কেমন আছে?
- জ্বি অনেকটা ভালো, কিন্তু আপনারা হঠাৎ? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?
- জ্বি, কিছুটা সমস্যা তো হয়েছে। নাহলে থানা থেকে তো এমনি এমনি আসিনি।
- একটু তাড়াতাড়ি বলবেন প্লিজ। আমি গতকাল রাত থেকে এখনো ঘুমাইনি।
- গতকাল রাতে ছাঁদের নতুন ভাড়াটিয়া রুদ্রর সঙ্গে আপনার শেষ কখন কথা হয়েছে?
তানিশা এবার কি যেন ভাবলো। তারপর বললো,
- ওহ্ আচ্ছা আপনারা সেই রুদ্র সাহেবের বিষয় তদন্ত করতে এসেছেন? আমি রাতে হাসপাতালে বসে শুনেছি বাসায় পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে।
- কখন কথা হয়েছে?
- সন্ধ্যার একটু পরে, আমি তখন ছাঁদে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হলো। তারপর কিছুক্ষণ কথা বলার পরে আমি নিচে চলে আসি নাস্তা করার জন্য।
- তারপর উপরে যাননি?
- নাহ
- কেন?
- কারণ নিচে নেমে দেখি বাবা কেমন জানি করছে। বাবার হার্টে সমস্যা আছে, তাই বেশিক্ষণ দেরি না করে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। আর হাসপাতাল থেকে এইমাত্র এসেছি।
- আপনি সত্যি বলছেন?
- আমি মিথ্যা কেন বলবো? আর কেন মনে হচ্ছে আমি মিথ্যা বলি। দেখুন ওই রুদ্র সাহেবকে দেখে ভদ্রলোক মনে হচ্ছিল তাই বাবা ভাড়া দিয়েছে। কিন্তু সে সন্ত্রাসী নাকি অন্য কিছু এটা তো আমরা জানতাম না।
- রুদ্র সন্ত্রাসী নয় পুলিশের লোক। আর গতকাল রাতে বৃষ্টি কমার পরে তার রুমের জানালা দিয়ে কেউ একজন রুদ্রর শরীরে বি!ষ দিয়েছে। যিনি কাজটা করেছেন তিনি নিখুঁতভাবে করেছে। আর রুদ্রর সেই লোককে দেখেছে।
- তাহলে তো হয়েই গেল, রুদ্র সাহেব যাকে দেখেছেন তাকে গিয়ে ধরুন।
- রুদ্র আপনাকে দেখেছে। রুদ্র বলেছে যে তার শরীর যখন আস্তে আস্তে খারাপ হচ্ছিল তখন সে জানালার সামনে আপনাকে দেখেছে।
- অসম্ভব, আমি তো হাসপাতালে ছিলাম তাহলে আমাকে কীভাবে দেখবেন তিনি?
- আপনি উত্তেজিত হবেন না। আপনি কোথায় ছিলেন আর তখন ছাদে কে ছিল সবকিছুই খুঁজে বের করা হবে। একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো।
- কি প্রশ্ন?
- আপনি রুদ্রকে বলেছিলেন নিয়াজ হাসান এক্সি!ডেন্ট করে মারা গেছে। কিন্তু আমার মনে হয় নিয়াজ হাসান এক্সি!ডেন্টে মরেনি তাকেও ছাদের ওই রুমে খু!ন করা হয়েছে। সম্ভবত আপনারা কোনকিছু এড়াতে গিয়ে সিস্টেম করে মৃত্যুটা এক্সি!ডেন্ট বলে চালাচ্ছেন।
তাইশা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই তার হাতের মোবাইলটা বেজে ওঠে। তাইশা কলটা কেটে দেয়। কিন্তু আবারও কল আসে। ওসি সাহেব বললেন,
- লাউডস্পিকার চালু করে রিসিভ করেন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাইশা রিসিভ করে। একটা পুরুষ কণ্ঠ অপরপ্রান্ত থেকে বলে,
" রুদ্র তো মারা যায়নি তাইশা, হাসপাতালে সে ওসি সাহেবের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে। ওসি সাহেব তোমার বাসায় যেতে পারে। গতকাল রাতে রুদ্রর সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছুই তুমি স্বীকার করবে না। বলবে তুমি হাসপাতালে ছিলে। "
কলটা কেটে গেল, তাইশা বিমর্ষ হয়ে তাকিয়ে রইল। ওসি সাহেব চোখের ইশারায় কিছু বললেন।
তাইশা বললো,
- বিশ্বাস করুন একে আমি চিনি না, অপরিচিত নাম্বার তাই প্রথমে রিসিভ করতে চাইনি। আমি কিছু করিনি আমার কথা বিশ্বাস করুন।
চলবে...

টু ফাইভ এইট জিরো -- ২

বাড়িওয়ালা বললেন,

তুমি যার দিকে প্রতিদিন তাকিয়ে থাকো, সে আমার একমাত্র মেয়ে, তবে বিধবা। বিয়ের আটদিন পরে স্ট্রোক করে ওর স্বামী মারা গেছে। এখন চুপচাপ আর শুনশান নীরবতা হচ্ছে ওর প্রিয় খুব প্রিয়।
বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগলো যেন। মেয়েটা চমৎকার সুন্দরী, রোজ সকালে তাকে ছাঁদে দেখি৷ আবার সন্ধ্যা বেলা থেকে গভীর রাত অব্দি ছাদের উপর পায়চারি করে। কখনো সাহস করে কথা বলতে যেতে পারিনি। অবশ্য আমি এ বাসায় ভাড়ায় উঠেছি মাত্র সপ্তাহ খানিক আগে। এ বাসায় আমি ভাড়া নেবার একটা বড় কারণ আছে। পেশাগত কারণেই এখানে আসা, কিন্তু কেন এসেছি সেটা এরা কেউ জানে না।
বললাম,
- আপনি তাকে আবার বিয়ে দেবার চেষ্টা করে দেখেননি? নাকি সবকিছু তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন?
- তাইশা (আঙ্কেলের মেয়ে) একটা ছেলেকে পছন্দ করতো। তাইশা তাকেই বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে সেই ছেলেকে নিজের একমাত্র মেয়ের জন্য যোগ্য মনে হয়নি। তাই তড়িঘড়ি করে আমি অন্য যায়গা তাইশার বিয়ে ঠিক করি।
- আপনার তো আর দ্বিতীয় কোনো মেয়ে নেই তাই না আঙ্কেল?
- হ্যাঁ! তাইশা আমার একমাত্র মেয়ে। তাইশার বড় দুই ভাই স্পেনে থাকে। আমার মেয়েকে যতটা রাগি মনে করো, সে কিন্তু ততটা রাগি নয়। ওর মতো মিশুক মানুষ খুব কমই আছে জগতে।
- তাইশার সেই প্রেমিকার কোনো খোঁজ জানেন? মানে আপনার মেয়ের এরকম পরিস্থিতিতে সেই ছেলের সাপোর্ট দরকার ছিল। সাপোর্ট পেলে সে হয়তো এতটা ডিপ্রেশনে যেত না।
আঙ্কেলের মুখটা বিমর্ষ হয়ে গেলন। মেয়ের এক্স বয়ফ্রেন্ডের কথা জিজ্ঞেস করাতে কেমন যেন বিব্রত হয়ে গেলেন।
মুহুর্তের মধ্যে গম্ভীর হয়ে তিনি বললেন,
- আমার মেয়ে গতকাল রাতে তোমার কথা জিজ্ঞেস করলো তাই তোমাকে ডেকে আমার মেয়ের কথা জানালাম। তুমি তো জানো তোমার অফিসের ম্যানেজারের অনুরোধে তোমাকে আমি আমার বাসা ভাড়া দিয়েছি।
- জ্বি তা ঠিক আছে, কিন্তু আপনি হঠাৎ করে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে এসব কেন বলছেন?
- তোমার নামটা যেন কি?
- শাকিল আহমেদ রুদ্র, সবাই রুদ্র বলে ডাকে।
- শোন বাবা রুদ্র, পারিবারিক আর পাবলিক বলে দুটো বিষয় আছে। কিছু কিছু বিষয় আছে আর সেগুলো পাবলিকের কাছে বলা যায় না বা প্রকাশ করতে হয় না।
- ঠিক আছে, ব্যক্তিগত বিষয় জিজ্ঞেস করার জন্য আমি দুঃখিত।
- এবার তুমি আসতে পারো।
কিছু রহস্য নিয়ে বাড়িওয়ালার সামনে থেকে বের হয়ে এলাম। বাড়িটা তৈরি করার সময় ছাদের এক প্রান্তে দুটো রুম করা হয়েছে। তার মধ্যে একটা রুম স্টোর হিসেবে ব্যবহার করেন বাড়িওয়ালা। আর একটা রুম খালি, আমি সেখানেই থাকি। রুমে এসে অফিস ড্রেস চেঞ্জ করে জানালার পাশে বসে রইলাম। একটু পরেই মাগরিবের আজান দিবে। আজানের পরেই তাইশা ছাঁদে আসবে। আমি মনে মনে আজ তাইশার সঙ্গে কথা বলার প্রতিজ্ঞা করলাম। খাটে বসেই জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলাম।
মোবাইলে রিং বাজতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। অফিস থেকে এসে ক্লান্ত ছিলাম তাই জানালার পাশেই বিছানায় কখন ঘুমিয়ে গেছি বুঝতে পারিনি। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি চট্টগ্রাম থেকে আমার বন্ধু রাশেদ কল করেছে।
- হ্যাঁ বন্ধু বল।
- কিরে কতবার কল দিলাম, রিসিভ করিস না কেন জানতে পারি?
- ঘুমিয়ে ছিলাম।
- তুই নাকি গতকাল আমার সেই পুরনো হাসপাতালে গিয়ে আমার খোঁজ করেছিস? আচ্ছা রুদ্র, তুই কি এখনো সেই একরাতে দেখা হওয়া মেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিস?
- তোকে কে বললো?
- আমি নাহয় হাসপাতাল থেকে চলে এসেছি কিন্তু আমার কিছু সহকর্মী তো আছে। তাদের মধ্যেই একজন তোকে চিনতে পেরেছে।
কথা বলতে বলতে জানালার দিকে চোখ গেল। তাইশা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। আমি রাশেদকে বললাম,
- দোস্ত আমি তোকে একটু পরে কল দেবো।
- কেন এখন কি হয়েছে?
- আরে বুঝতেই তো পারছিস, ঘুম থেকে উঠেছি তাই ওয়াশরুমে যেতে হবে।
- আচ্ছা ঠিক আছে যা তাহলে।
মোবাইল কল কেটে দিয়ে দরজা খুলে বাহিরে বের হলাম। আস্তে আস্তে তাইশার কাছে গিয়ে একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইলাম। কি বলে প্রথম কথা শুরু করবো সেটা মনে মনে সাজাচ্ছি।
আমাকে অবাক করে দিয়ে তাইশা বললো,
- সন্ধ্যা বেলা ঘুমের অভ্যাস ভালো না, শরীর অসুস্থ হয়ে যাবে। তারচেয়ে বরং অফিস থেকে ফিরে ছাঁদে বসে থাকবেন। শহর জুড়ে সন্ধ্যার আগমনে আস্তে আস্তে অন্ধকার হবার দৃশ্য দেখবেন।
আমি কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম,
- আপনি কেমন আছেন?
- আমি তো ভেবেছিলাম আপনি শুধু জানালা দিয়ে উঁকি দেওয়া ছাড়া আর কিছু পারেন না। এখন তো দেখি মেয়েদের সঙ্গে কথাও বলতে পারেন।
- আসলে একটা কথা জানার খুব ইচ্ছে।
- কি কথা?
- সরাসরি বলবো নাকি ভূমিকা, প্রসঙ্গ তারপর মূল বক্তব্য।
- ভূমিকা আর প্রসঙ্গ অলরেডি শেষ হয়ে গেছে। এবার মূল বক্তব্য শুরু করতে পারেন।
- আপনার বাবার কাছে আপনার সম্পর্কে কিছু কিছু কাহিনী শুনলাম। সবকিছুর মধ্যে আমার শুধু আপনার এক্স বয়ফ্রেন্ডের কথা জানতে ইচ্ছে করছে।
- ওর কথা কেন? আর কি কি জানতে চান?
- মানে সে কোথায় আছে, আপনি তার সঙ্গে বিয়ে করবেন না বলে কীভাবে মিটমাট করেছেন। সে আপনাকে পাবে না জেনে কিরকম আচরণ করেছিল? আপনার হাসবেন্ড মারা যাবার পর সে কি যোগাযোগ করেছে?
তাইশা মুখ ঘুরিয়ে বললো,
- আজই আপনার সঙ্গে আমার প্রথম কথা শুরু। আর আজই আপনি এতকিছু জিজ্ঞেস করছেন?
- আপনার বাবার কাছে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি অদ্ভুত আচরণ করেছেন। তাই আরো বেশি আগ্রহ দেখা দিচ্ছে। আর আমি একবার একটা বিষয় আগ্রহী হলে সেটা শেষ নাহলে কোনকিছু ঠিক মতো করতে পারি না।
- সে আমার বিয়ের আগেই মারা গেছে। আশা করি তার পরের প্রশ্ন গুলোর আর কোনো উত্তর দিতে হবে না।
প্রায় দুই মিনিটের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর বললাম,
- কীভাবে মা!রা গেছে?
- এক্সি!ডেন্টে।
- এক্সি!ডেন্ট নাকি হ!ত্যা?
- মানে?
- না কিছু না।
- আপনার প্রশ্ন করা শেষ হয়েছে?
- জ্বি। আরেকটা কথা, তার নাম কি ছিল?
- নিয়াজ হাসান। এবার কি আমরা প্রসঙ্গ পাল্টে কথা বলতে পারি?
- জ্বি।
- বাবার কাছে শুনলাম আপনি এখনো বিয়ে করেননি। আপনি চাকরি, তারপর বাকি সবকিছু তো ঠিকঠাক আছে। তাহলে বিয়ে করতে আর কতো দেরি? নাকি কারো জন্য অপেক্ষা?
- বিয়ে না করেই তো বেশ ভালো আছি।
- কিন্তু এই-যে বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে কতটা ঝামেলা পোহাতে হয়। এরচেয়ে তো বিয়ে করে পরিবার নিয়ে থাকা ভালো।
- আপনার স্বামী যেদিন মারা গেলেন সেদিন আপনি কোথায় ছিলেন? বাবার বাড়িতে নাকি শশুর বাড়িতে।
- আবার সেই প্রসঙ্গ?
- রাগ করলেন?
তাইশা তার মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে বললো,
- আমার নাস্তা করার সময় হয়ে গেছে। প্রতিদিন এই সময়ে নাস্তা করে তারপর আবার ছাদে আসি। আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে।
- ঠিক আছে।
তাইশা চলে গেল, বাবা মেয়ের দুটো ভিন্ন চরিত্র আবিষ্কার করলাম। তাইশার বাবা নিয়াজ হাসান এর কথা শুনে গম্ভীর হয়েছিল। আর তাইশা চলে গেল তার স্বামীর কথা শুনে। দুজনের এই গম্ভীর হবার রহস্যের সঙ্গে কারণ কি আলাদা নাকি একই বুঝতে পারছি না।
তাইশার সঙ্গে আর দেখা হলো না। কারণ কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি নামলো। আমিও আর দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত রুমের মধ্যে গিয়ে বসলাম। রাতে আমার শুকনা খাবার ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয় না। তাই রাতের খাবার শেষ করে বিছানায় বসে বসে খোলা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইলাম৷ মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ভেজা শহরের দিকে তাকিয়ে কিছু সময়ের জন্য নিজের দায়িত্ব যেন ভুলে গেলাম।
প্রায় ঘন্টা খানিক পরে বৃষ্টি কমলো। বৃষ্টি নামার একটু পরেই বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে। আমি একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। রুমের মধ্যে তখন হালকা গরম লাগছিল। বৃষ্টির কারণে গরম কমার কথা কিন্তু তেমন কমলো না।
যেহেতু বৃষ্টি হয়েছে তাই বাহিরের বাতাস ছিল খুব ঠান্ডা। জানালার গ্লাস এক সাইডে সরিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ছোট্ট একটা রুম, জানালার পাশেই খাট। জানালা দিয়ে হালকা বাতাস প্রবেশ করছে রুমে। রাশেদের কাছে আর কল করা হলো না।
কখন ঘুমিয়েছি জানি না, কিন্তু শরীরের মধ্যে তীব্র জ্বালাপোড়া অনুভূতি হবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙ্গে গেল। সম্পুর্ণ শরীর জ্বলে যাচ্ছিল, হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম আমার পায়ে কোনো শক্তি পাচ্ছি না। মুখ দিয়ে শুধু বাঁচাও বাঁচাও শব্দ করলাম।
এমন সময় জানালার সামনে কারো ছায়ামূর্তি দেখতে পেলাম। কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ছায়ামূর্তি বললো,
- কেমন লাগছে সাহেব? খুব কষ্ট তাই না?
কণ্ঠটা তাইশার, আমি অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সমস্ত শরীর ব্যথায় অচেতন হবার অবস্থা। তাইশা আবার বললো,
- আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড এখানে এই রুমেই ভাড়ায় থাকতো। আপনি এখন যেভাবে মারা যাচ্ছেন, ঠিক সেভাবেই তাকেও খু!ন করেছিলাম। মৃত্যুর পরে ওপাড়ে ভালো থাকবেন সাহেব। বিদায়।

টু ফাইভ এইট জিরো -- ১