Friday, April 19, 2024

 মতিঝিলে একটা বিল্ডিং আছে। বিল্ডিংটার নাম, ''জাতীয় চা বোর্ড''। ঢাকা শহরে কোনো চা বাগান নেই, কিন্তু জাতীয় চা বোর্ড নামক সরকারি প্রতিষ্ঠানটি খোদ ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।





ঢাকায় মাছের চাষ হয় না। কিন্তু ''মৎস্য ভবণ'' দখল করে আছে রমনার একটি এলাকা।
ঢাকার কোথাও ধান, গম, মুলা চাষ হয় না। কিন্তু ''খামার বাড়ি'' নামক বিশাল ভবণটি ফার্মগেটে বসে আছে।
একটা দেশে ৬৪ টি জেলা আছে।
সেই দেশের ৬৩ জেলাকে বাদ দিয়ে সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছে মাত্র ১টি জেলায়। ঢাকাতে।
যে মৎস্য ভবণ থাকার কথা চাঁদপুরে, সেটি ঢাকায়।
যে খামার বাড়ি থাকার কথা ময়মনসিংহে, সেটিও ঢাকায়।
চা বাগানের শহর সিলেট বাদ দিয়ে, চা বোর্ডটিও আমরা বসিয়ে রেখেছি ঢাকায়।
# অনেক দেশ তাদের রাজধানী পরিবর্তন করেছে।আমাদের সময় এসেছে বিকল্প কিছু ভাবার
এরপরও যখন আপনারা যানজট নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন, তখন আমার খুব হাসি পায়।রিকশা, হকার মুক্ত ফুটপাথ চাই।
কেউ কেউ বলেন, ফ্লাইওভার আর মেট্রোরেলের কথা। ভাই রে, এই ছোট্ট শহরে কয়টা মেট্রোরেল দেবেন? কয়টা ফ্লাইওভার বসাবেন? ফ্লাইওভার আর মেট্রোরেলের পাশাপাশি যদি হেলিকপ্টার সার্ভিসও দেন, ঢাকার আকাশে হেলিকপ্টারের মুখোমুখি সংঘর্ষ হবে, তবু যানজটের খুব বেশি উন্নতি হবে না।
তার চেয়ে পুরো বাংলাদেশের ৬৪ টা জেলাকেই ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শিখুন। দেশের প্রতিটি ইঞ্চিকে সমানভাবে ভালবাসুন। উন্নয়ণের জোয়ার ভাটার খেলা কেবল এই ছোট্ট শহরে মধ্যে না চালিয়ে, সারা বাংলাদেশে চালান।
তাহলে দুটো জিনিস হবে।
১. পুরো বাংলাদেশে এগিয়ে যাবে।
২. ঢাকায় কোনো যানজট থাকবে না
এত ছোট শহরে এত মানুষ। এত দোকান অল্প জায়গায়। তাইতো বংগ বাজার পুড়ে গেল।।গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হবে।আসুন গ্রামে যাই
ঢাকার যানজট নিরসনের এটাই একমাত্র পদ্ধতি।
নেট থেকে ডাউনলোড করা আইডিয়া বাদ দিয়ে, একটু মাথা ঘামান।
মাথা কেবল চুল আচড়ানোর জন্য নয়। মাঝে মাঝে মাথা খাটিয়ে বুদ্ধি বের করতে হয়। ওটাই কিন্তু মাথার আসল কাজ। বুদ্ধি বের করা।

গুরুত্বপূর্ণ হোক সকল জেলা

Monday, April 1, 2024

 সাজু ভাই চুপচাপ তাকিয়ে রইল। অন্তরা তৎক্ষনাৎ কিছু একটা বলার জন্য নিজের মগজের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছেন। হয়তো ভাবতে পারেনি সাজু ভাই এরকম কোনো প্রশ্ন নিয়ে হাজির হবে।

- কি হলো , সাজুর কথার উত্তর দিচ্ছেন না কেন?
পাশ থেকে জিজ্ঞেস করলো লিয়াকত।



- আমি ওনাদের নাটকের খুব ভক্ত ছিলাম। তাই শুটিং দেখার জন্য গেছিলাম।
কাপা কণ্ঠে বললো অন্তরা।
সাজু বললো ,
- কোনকিছু করার আগে সেই বিষয় সবদিক থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। এতো কাঁচা কাজ যারা করে তাদের দ্বারা খুন করা মানায় না।
সাজুর কথা শুনে যারা যারা কাছাকাছি ছিল তারা সবাই চমকে গেল। অন্তরা বললো ,
- কি বলছেন এসব? কে খুন করেছে?
সাজু সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লিয়াকতের দিকে তাকিয়ে বললো৷
- হাসপাতাল অসুস্থ মানুষের আনাগোনা। এখানে দাঁড়িয়ে ডাক্তার আর রোগীদের কষ্ট দেয়া ঠিক না। এদের সবাইকে থানায় নিয়ে চল৷
সাজু এগিয়ে যায় আসলাম ফরাজির কাছে। রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ,
- আপনাকে রাতে টেক্সট করেছিলাম। আপনি তো কোনো রেসপন্স করলেন না।
- ভেবেছিলাম রেস্টুরেন্টে গিয়ে কথা বলবো। তাছাড়া সকালে উঠে আঙ্কেলের অসুস্থতার কথা শুনে আমরা এখানে ছুটে এসেছি।
- ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদ আপনার আঙ্কেল?
- আমার স্ত্রীর বন্ধু। এরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতো তাই জানাশোনা আছে।
- আপনারা একটু থানায় চলুন।
রাবেয়ার মা আপত্তি জানিয়ে বললো ,
- আমরা রোগী দেখতে এসেছি। আপনাদের সঙ্গে থানায় যাবার জন্য আসিনি।
আসলাম ফরাজির দিকে তাকিয়ে সাজু বললো ,
- চলুন৷ সব কথা সেখানেই হবে।
ভিডিও দেখার পরে অন্তরা যতটা অবাক হইছিল। তারচেয়ে বেশি অবাক হলো যখন দেখলো তার বয়ফ্রেন্ড কবির থানায় বসে আছে।
অন্তরার দিকে তাকিয়ে কবির এতটাই করুন চেহারা করলো যেটা দেখে অন্তরা বিড়বিড় করে বললো “ সব শেষ ”!
ওসি সাহেব , এসআই লিয়াকত আলী ও সাজুর সামনে মুখোমুখি বসে আছে অন্তরা ও কবির। খানিকটা কাছেই বসে আছে আসলাম ফরাজি ও তার স্ত্রী কন্যা।
সাজু বললো ,
- কবির সাহেব অলরেডি সবকিছুই স্বীকার করে ফেলেছে। মিথ্যা স্ক্রিপ্ট না সাজিয়ে যদি আপনিও সবকিছু স্বীকার করেন তাহলে সময় নষ্ট হবে না।
অন্তরা চুপ করে রইল। ওসি সাহেব বরিশালের মানুষ। কথার মধ্যে দু একটা বরিশালের শব্দ চলে আসে। সে বললো ,
- মেয়ে মানুষের তো এতো লোভ থাকা ভালো না।
অন্তরা মাথা নিচু করে বসে আছে। কবিরকে এরা কীভাবে নিয়ে এলো সেটাই বুঝতে পারছে না। সে বারবার কবিরের দিকে তাকাচ্ছে। সাজু বুঝতে পেরে বললো ,
- আপনার বয়ফ্রেন্ডই পিৎজা ডেলিভারি করতে আপনার মামার বাসায় গেছিলো তাই না? অবশ্য এমন গোপন কাজে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছাড়া সফল হওয়া যায় না।
রাতে ফেসবুকে ভিডিওটা দেখার পরে সাজু খুঁজে খুঁজে অন্তরার ফেইসবুক আইডি বের করে। প্রথমে ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদ , তারপর সেখান থেকে অন্তরা।
যেহেতু অন্তরা নিজেই তার রিলেশনশিপের কথা গতকাল রাতে শেয়ার করেছিল। তাই সাজু ধরেই নিছিল আইডি থেকে বয়ফ্রেন্ডের সন্ধান পাওয়া যাবে। এবং পেয়েও গেল সেটা। বেশ কিছু পোস্টে তাদের একে অন্যের প্রোফাইল ট্যাগ করা।
ভিডিওতে অন্তরার সঙ্গে আরেকটা ছেলেকে দেখার পর থেকেই সাজু ভাই কৌতূহলি হয়েছিল। যদিও সেখানে অনেক মানুষ ছিল কিন্তু একটা ছেলেকে তার কাছে একটু অন্যরকম লাগছিল। তারপর যখন অন্তরার আইডি পাওয়া গেল তখন সবকিছু আরো পরিষ্কার হয়ে যায়।
ভিডিওর ছেলেটাই অন্তরার বয়ফ্রেন্ড সেটা সম্পুর্ণ নিশ্চিত হয়ে যায় সাজু ভাই। আর সেজন্যই সাজু ভাই লিয়াকতকে ছবি পাঠিয়ে বলেছিল ছেলেটা সম্ভবত হাসপাতালের আশেপাশে আসবে৷ তাকে পেলেই যেন গ্রেফতার করে থানায় নেয়া হয়।
কাজটা করার জন্য লিয়াকত নিজেই অন্ধকার থাকতেই হাসপাতালের সামনে চলে আসে সাধারণ মানুষের পোশাক পরে। প্রায় ঘন্টা খানিক দুর থেকে অন্তরার প্রতি নজরদারি করার পরে ছেলেটাকে দেখতে পায়। অন্তরার সঙ্গে কানাকানি ফিসফিস সব শেষ করে ছেলেটা যখন বের হয় তখন বাইরে বসেই তাকে আটক করে। সাজু বলেছিল অন্তরা যেন বুঝতে না পারে।
এরপর থানায় রেখে লিয়াকত বাসায় চলে যায়। দ্বিতীয়বার সাজুর কল পেয়ে আবার হাসপাতালে আসে।
- খুনের সম্পুর্ণ পরিকল্পনা কার ছিল?
প্রশ্ন করলো সাজু ভাই।
- অন্তরার।
থমথমে হয়ে জবাব দিল কবির। ছেলেটাকে খুব ভীতু মনে হচ্ছে। এরকম একটা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনটা খুন করলো কীভাবে সাজু ভেবে পায় না।
- আপনার নীরবতার বরফ গলে গেলে সবকিছু খুলে বলুন৷
অন্তরা তাকালো। সাজু চোখে চোখ রেখে বললো ,
- হুট করে কাউকে সন্দেহ করা যায় না অন্তরা। তাছাড়া আপনার অভিনয় দক্ষতা অনেক কাঁচা। মার্শাল আর্টে আপনি পরিপক্ব হতে পারেন কিন্তু অভিনয়ে খুব কাঁচা। আপনার প্রতি আমার প্রথম সন্দেহ আপনার মামার বাসাতেই হয়েছিল। আপনি দরজা খুলে প্রথমেই যখন আমাকে চিনতে পারলেন তখনকার অভিনয়টাই আপনার প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি করে।
অন্তরা তাকিয়ে রইল।
- সাজু বললো , আপনি বললেন আমি নাকি লেখক হিসেবে বেশ সেলিব্রিটি। আমার লেখার খুব ভক্ত আপনি। আমার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সবকিছু বলেছেন ঠিক আছে। কিন্তু আরেকটু সময় নিলে বুঝতে পারতেন আমি গল্প লেখি না। ওগুলো অন্য কেউ লেখে। তাই আমাকে লেখক হিসেবে চেনার কোনো উপায় নেই।
দ্বিতীয় সন্দেহ , নুড়ি ও দারোয়ান দুজনকে আগে ঘাড় মটকে তারপর খুন করা হয়েছে। আপনার মামার বাসায় দেয়ালে দুটো ছবি ঝুলানো আছে। সেখানে আপনাকে দেখা যাচ্ছিল মার্শাল আর্টের ড্রেস পরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
সুতরাং তাৎক্ষণিকভাবে আমার মাথার মধ্যে নুড়ি ও দারোয়ানের ঘাড় মটকানোর কথা সবার আগে চলে আসে। আপনার আর তৃতীয় আরেকটা ভুল হচ্ছে সিম নাম্বার ব্যবহার করা। যে সিম দিয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে আমাকে কল করেছিলেন , একই সিম দিয়ে কবির সাহেবের সাথে পরে যোগাযোগ করা ঠিক হয়নি।
সাজু আবার বললো ,
- আপনি কীভাবে সেই বাসায় গিয়ে তাদের খুন করলেন সেটুকু জানতে চাই। শুটিং হাউজের উপর থেকে ছাদে গেছেন ততটুকু কবির সাহেবের মাধ্যমে আমরা জানি। বাকিটা বলেন।
সাইমুন ও নুড়ির মা-বাবা সবাই থানায় এসেছে।
ওসি সাহেব ও সাজু সবাই বারবার প্রশ্ন করে যাচ্ছে অন্তরার কাছে। সবার তাড়া খেয়ে অবশেষে মুখ খোলে অন্তরা।
- মামা যখন অজ্ঞাত মানুষের সঙ্গে নুড়ির ক্যান্সার নিয়ে বিভিন্ন চুক্তি করছিল তখন আমি সবকিছু শুনে ফেলেছিলাম। মামা সবসময় ছাদে গিয়ে কথা বলতো। সপ্তাহ খানিক আগে একদিন হঠাৎ জানতে পারি নুড়িকে খুন করার কন্ট্রাক্ট দিতে চায়। কিন্তু মামা প্রস্তাবে রাজি হয় না। সে বলে , এমনিতেই আমি অনেক পাপ করছি। মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে মেয়েটাকে অসুস্থ করে রাখছি। কিন্তু খুনখারাবির মধ্যে আমি নাই। টাকা দ্বিগুণ দিলেও করতে পারবো না। আমি ডাক্তার, খুনি না।
তখন টাকার বিষয়টা আমার মাথায় ঢুকে যায়। ছোটবেলা থেকে টাকাপয়সার অভাবে জীবন আমার। যেহেতু আমি মার্শাল আর্টে দক্ষ তাই রাতারাতি অনেক টাকা ইনকামের একটা নেশা আমার মধ্যে ঢুকে যায়। মামার মোবাইল থেকে আমি নাম্বারটা নিয়ে সেখানে কলব্যাক করি।
- নাম্বার দেখে অবাক হননি? নাম্বারটা তো পরিচিত হবার কথা।
- হ্যাঁ হয়েছিলাম। কিন্তু আমি আমার নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলাম।
- যার সঙ্গে আপনার টাকাপয়সার চুক্তি হয়েছিল তিনি তো এখন থানায় উপস্থিত আছে তাই না?
- হ্যাঁ আছে।
সাজু একবার পিছনে তাকালো। আসলাম ফরাজি ঘামছে , টেনশনে মাথা এলিয়ে দিয়েছেন।
অন্তরা বললো৷
- আমি নাম্বার দিলে সেখানে কথা বলে চুক্তি ঠিক করে কবির। আমরা তাকে বলি যে ডাক্তার সাহেব আমাদের নাম্বার দিয়েছে। কিন্তু তবুও তিনি রাজি হচ্ছিল না। তারপর আমরা বলি তাদের পরিকল্পনা সবাইকে জানিয়ে দেয়া হবে। তখন তিনি রাজি হন। তারপর উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা দুজন সব প্ল্যান করি।
প্রথমে শুটিং হাউজ থেকে দুই ফ্লোর উপরে ছাদে চলে যাই। ছাদে একটা রশির সঙ্গে গেইটের চাবি ছিল। সেটা দিয়ে তালা খুলে ফেলি৷ তারপর আস্তে আস্তে নিচে গিয়ে নামি। কিন্তু পুরোপুরি নামার আগেই বুঝতে পারি কে যেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল দিচ্ছে। একটু পর মেয়েটা ভিতরে চলে গেল। তখন দরজার সামনে গিয়ে মাস্টার চাবি দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করি কিন্তু তার আগেই বুঝতে পারি দরজার লক খোলা। তাই দেরি না করে ভিতরে চলে যাই। সাইডের একটা রুমে গিয়ে বিছানায় মোবাইল বাজতে দেখে সেই মোবাইল হাতে নিয়ে আমি লুকিয়ে যাই। একটু পরে নুড়ির বোনটা রুমে এসে মোবাইল খোঁজে৷ আমি তখনও দাড়িয়ে আছি মুর্তি হয়ে। একটু পরে সেই বাহিরের মেয়েটা চলে গেল। আমি আর দেরি না করে ছোট মেয়েটা আবার রুমে আসতেই দরজা পিছন থেকে বের হয়ে তার মুখ চেপে ধরে গলায় ছুরি ঢুকিয়ে দেই। মেয়েটা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেল।
এরপর নুড়ির রুমে গিয়ে অপেক্ষা করি। নুড়ি তখন বাথরুমে ছিল। সে বাথরুম থেকে বের হতেই আমি তার ঘাড়টা ভেঙ্গে দেই। তারপর তাকেও ছুরি দিয়ে মারি। শর্ত ছিল খুন করার পরে ডাক্তারের যত রিপোর্ট সেগুলো নিয়ে যেতে হবে। তাই রিপোর্ট খুঁজে বের করতে করতে হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পাই। হালকা ভাবে দেখি বাড়ির দারোয়ান পাশের ছোট মেয়েটার রুমে ঢুকেছে। আমি দেরি না করে তাড়াতাড়ি ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাই। কিন্তু চতুর দারোয়ান আমাকে দেখে ফেলে। তাই পিছনে পিছনে ছাদে চলে আসে।
প্রথমে লুকানোর চেষ্টা করছি। পরে বাধ্য হয়ে লোহার সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাই। কিন্তু বদমাশ দারোয়ান সেখানেও চলে যায়। তাই তাকেও বাধ্য হয়ে খুন করতে হয়।
তারপর দ্রুত লোহার সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে ছাদের সাইড দিয়ে পাশের চার তলায় চলে আসি। কবির সেখানে অপেক্ষা করছিল। দুজন দ্রুত বের হতে যাই কিন্তু চারিদিকের ক্যামেরা.....
অন্তরা চুপ হয়ে গেল। পিছনে আসলাম ফরাজি ও তার মেয়ে রাবেয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। কিন্তু রাবেয়ার মায়ের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে মহিলা অস্বস্তিতে রয়েছেন। সাজু রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ,
- আপনার মা'কে একটু সামনে নিয়ে আসুন।
তারা সামনে আসে। তখন লিয়াকত বলে ,
- আন্টি আপনি কি বুঝতে পারছেন আমরা কেন আপনাকে সামনে আসতে বলেছি?
রাবেয়ার মা অন্তরার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে বিশ্বাস করতে পারছেন না এই মেয়েটাকেই তিনি কাজটা দিয়েছেন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে সেটা করতে হয়েছে কারণ মেয়েটা জেনে গেছিল তারা নুড়ির ক্যান্সার নিয়ে নাটক সাজিয়েছে। তাই সেই মুহূর্তে কিছু করার ছিল না। রাবেয়ার মা আস্তে আস্তে যতকিছু বললো তা হচ্ছে ,
তৃপ্তিদের কোম্পানির কাজটা নিয়ে সাজুর কাছে যতটুকু তথ্য আছে তা হচ্ছে , প্রজেক্টটা ইউরোপের কোনো একটা দেশের। কোম্পানির প্রথম শর্ত ছিল তারা কিছু কাজ করাবে যেগুলোর ফর্মুলা শুধু একজনই জানতে পারবে। সেই একজন সবার কাছ থেকে কাজগুলো আদায় করবে৷
কাজটা প্রথমে রাবেয়ার মা যেই অফিসের জেনারেল ম্যানেজার সেখানে দেয়া হইছিল। কিন্তু তাদের কিছু ত্রুটির কারণে বিদেশি কোম্পানিটা এই কাজ কেড়ে নিয়ে তৃপ্তিদের দিয়ে দেয়।আর তখন থেকেই সব ঝামেলার শুরু।
ডাক্তারের আগে তাই সাইমুনের সঙ্গে সবকিছু নিয়ে কথা বলতে চায়। কিন্তু সাইমুন রাজি হয়নি বলে নতুন পরিকল্পনা করে কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার রাবেয়ার মা, মিথ্যা ক্যান্সারের নাটক সাজিয়ে দেয় যেন সাইমুন তার স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অথবা চিকিৎসার জন্য কোথাও নিয়ে যায় তাহলে তো কাজটা করতে পারবে না।
কিন্তু যখন দেখলো সাইমুন তবুও কাজের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তখন আরো ক্ষেপে যায়। আর শেষ মুহূর্তে এসে খুনের সিদ্ধান্ত নেয়। সেজন্য ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করার চেষ্টা করে যেন পৃথিবী থেকে সরানো যায়। কিন্তু ডাক্তার রাজি নাহলে বেশি চিন্তায় পরে যায় তারা। আর তখনই কল আসে একটা ছেলের।
সে জানায় সবকিছু , কথার মাধ্যমে চুক্তিবদ্ধ হয়।
সরাসরি সাইমুনকে কিছু করেনি কারণ তাহলে অফিসের চক্রান্ত সবাই সন্দেহ করবে৷ তাই নুড়ির মাধ্যমে মানসিক আঘাত করছে।
আসলাম ফরাজি নিজের স্ত্রীর প্রতি তাকিয়ে ছি ছি করলেন। রাবেয়া যেন বিশ্বাস করতে পারছে না তার মা সবকিছু চক্রান্ত করেছে।
অন্তরাকে সাজু বললো ,
- আপনার মামাকে কেন খুন করার চিন্তা হলো।
- মামা সবকিছু বুঝতে পেরেছিল।
- সেজন্য বয়ফ্রেন্ডকে ডেলিভারিম্যান সাজিয়ে নিয়ে আসেন তাই না?
- উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি খুন করার পরে আমরা সবাই সেখান থেকে তদন্ত শেষে যখন বাসায় আসি তখনও আপনার বয়ফ্রেন্ড আমাকে মেসেজ করেছিল। আমি তখনই জানতে পারি নুড়ির ক্যান্সার ছিল না। নিজের মামাকে বারবার ধরিয়ে দেবার বেশ চেষ্টা করেছেন।
অন্তরার মাথা নিচু হয়ে গেল। সাজু অস্বস্তিতে উঠে গেল সেখান থেকে। দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে আবার বমি করলো। শরীর যেন আর সঙ্গ দিচ্ছে না।
বাথরুম থেকে বের হয়ে সাজু ভাই ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো।
- স্যার মোটামুটি সবকিছু রেডি। বাদীরা সবাই আছে, আপনার যেভাবে সুবিধা সেভাবে মামলা সাজিয়ে দিন। এমনভাবে দিবেন যেন মানুষের
--------------
ব্যস্ত রাস্তার একপাশে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাজু ভাই ও লিয়াকত আলী।
লিয়াকত বললো ,
- তোর শরীর ভালো না। ডাক্তার দেখিয়ে নিস।
- এই শরীর আর ভালো হবে না। আমার মায়েরও এরকম রোগ ছিল। তারপর একসময় তো মা মারা গেল। হয়তো আমিও চলে যাবো কোনো এক শ্রাবণের দিনে।
- সবাই চলে যাবে , কিন্তু বাঁচার জন্য লড়াই করে যেতে হবে। যতদিন বেঁচে থাকা যায়।
- চেষ্টা তো করছি।
- একটা বিয়ে কর সাজু , ছোট্ট একটা সংসার হোক তোর। জীবন এভাবে শহরে শহরে ঘুরে ঘুরে কাটানোর দরকার কি।
- ধুর পাগল। বললাম তো শরীরের বিশ্বাস নেই। বিয়ে করে সংসার করলাম, একটা বাচ্চা হলো আর তখন যদি আমি মরে যাই? তখন আরেকটা সাজু তৈরি হবে আমার মতো তাই না?
লিয়াকত কিছু বললো না। সাজু চা শেষ করে বিদায় নেবার জন্য হাত বাড়ালো। আপাতত তার আর কাজ নেই। বাইক নিয়ে রওনা দিল কিন্তু পথিমধ্যে সাজুর আবার বমি পেল। বাইক দার করিয়ে রাস্তার পাশে বমি করলো। এবার বমির সঙ্গে রক্ত বের হয়ে আসছিল। এক রিকসাওয়ালা রিকশা দাঁড় করিয়ে সাজুকে এসে ধরলো। সাজু সেই লোকটার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সমাপ্ত।
দুই বছর ধরে লেখালেখি করি না। মূলত ব্যস্ততার জন্যই সাহস করতে পারি না। অনেকেই জানেন আমি পেশাগত জীবনে নাটকের স্ক্রিপ্ট রাইটার। সুতরাং প্রতিদিন আমার মস্তিষ্কের অনেকটা সময় ব্যয় হয় স্ক্রিপ্ট লেখায়। সেজন্য যতটুকু সময় পাই সেই সময়ে মস্তিষ্ক বিশ্রামে রাখার চেষ্টা করি।
লেখালেখি সম্ভবত ভুলে যাচ্ছি।

উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি -- ৮ [সমাপ্ত]

বিকেল চারটার দিকে রাবেয়ার কাছে কল দেয় সাকিব। দেখা করতে চায়। রাবেয়া বেশ অবাক হয়ে যায় কারণ অনেকদিন ধরে সাকিবের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

রাবেয়া হঠাৎ সন্দেহ হয় , তাহলে কি সাজু ভাই সাকিবকে বলে দিয়েছে? নাকি সাকিবের কাছে জিজ্ঞেস করার কারণে সাকিব তাকে সন্দেহ করছে। সাকিব বলে , - বেশি সময় নেবো না। মোবাইলেও বলতে পারতাম কিন্তু আমার মনে হয় সামনাসামনি কথা হলে ভালো হবে। - ঠিক আছে , আমি রাত দশটার পরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে তোমাকে কল করবো। এতটুকু বলেই তখনকার আলাপ শেষ করে রাবেয়া। কিন্তু তার মনের মধ্যে কিছুটা ভয় কাজ করতে শুরু করে। সে যেহেতু পুলিশের কাছে তার উদ্দেশ্য জানিয়ে দিয়েছে। সাকিব স্বাভাবিক ভাবে তার উপর রেগে যেতে পারে। এদিকে সত্যি সত্যি যদি সাকিব কাজটা করিয়ে থাকে তাহলে পরে সেখানে রাবেয়া জড়াতে পারে। নিজেকে কিছুটা সাহসী রাখার জন্য রাবেয়া তার পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টে সাকিবকে আসতে বলে। সাকিব বেশ স্বাভাবিক৷ রাবেয়ার কাছে সাকিব কল করার পরে রাবেয়া একবার মনে মনে ভেবেছিল সাজু ভাইকে বিষয়টা জানানো উচিত। কিন্তু কোন টপিকে কথা বলে সেসব চিন্তা করে আর জানানো হয়নি। - কেমন আছো তুমি? - যেমন দেখছো। - আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলার জন্য তোমাকে ডেকেছি। ভালোবাসার কোনো কথা নয়। - বলো,কিন্তু যা বলার একটু তাড়াতাড়ি বলবে। সারাদিন রেস্টুরেন্টে ছিলাম তাই তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে। - নুড়ি আর তার ছোটবোন নাকি খুন হয়েছে। তোমাদের বাসার দারোয়ান , তাকেও নাকি খুন করা হয়েছে। - হ্যাঁ। - দেখো তুমি হয়তো ভাবতে পারো আমি নুড়িকে খুন করেছি। ভাবতেই পারো কারণ তোমার সাথে একসময় এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম। কিন্তু এসব চিন্তা আমি তখনই মাথা থেকে বের করে দিয়েছি। রাবেয়া কিছু বললো না। তার মনের নব্বইভাগ অংশ জুড়ে বলছিল সাকিবই খুনটা করিয়েছে। কিন্তু সে এখন বলছে এসব সে ভুলে গেছে। সত্যি সত্যি যদি ভুলে যায় তাহলে নুড়ি ভাবিকে খুন করলো কে? আর কেন? সাকিব আবারও বলতে শুরু করলো , - তুমি এসব পুরনো কথা পুলিশের সঙ্গে বলতে যেও না। মা'কে চিকিৎসার জন্য ইন্ডিয়া নিয়ে যেতে হবে। এই সময় পুলিশের ঝামেলায় পড়তে চাই না। কিন্তু আমি অলরেডি তোমার কথা বলে দিয়েছি। আস্তে করে উত্তর দিল রাবেয়া। রাবেয়ার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাকিব। বললো, - তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তুমি জানো এখন আমার কতো বিপদ হতে পারে। - আমি তো তাদের বলিনি যে তুমিই খুন করেছো। আমি বলেছি যে তোমার সাথে তার শত্রুতা ছিল। তার ক্ষতি করার মতো একটা সিদ্ধান্ত তোমার মনের মধ্যে পুষে রাখছো। তারা তো হুট করে তোমাকে গ্রেফতার করবে না। সবকিছু তদন্ত করে প্রমাণ পেলে তখন গ্রেফতার করার প্রসঙ্গ আসবে। তাছাড়া! - তাছাড়া কি? - তুমি তো সবসময় নেতাদের সঙ্গে ওঠবস করো। যদি কোনো অপরাধ না করো তবে তোমার চিন্তা কি। - কিন্তু তুমি আমার কাছে কিছু না জিজ্ঞেস করে এভাবে পুলিশের কাছে সাক্ষী দিয়ে দিলে? অদ্ভুত! - অদ্ভুতের কিছু নাই, আমি বাসায় গিয়ে সাজু ভাইকে কল দিয়ে বলে দেবো যে তুমি নিজের মুখে স্বীকার করছো তুমি কিছু করো নাই। তারা চাইলে তোমার পিছনে লাগবে আর না চাইলে অন্য কারো পিছনে থাকবে। ––––––––––––––––– এসআই লিয়াকত আলীর গুপ্তচর সাকিব রাবেয়ার এরূপ কথাবার্তা শুনতে পায়নি। সেরকম কোনো নির্দেশও নেই। নজর রাখার আদেশ আছে তাই নজর রাখছে। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে দেখে ছবি তুলে পাঠিয়েছে। কিন্তু সাকিব ও রাবেয়ার মধ্যে যেসব কথা হয়েছে সেগুলো যদি সাজু বা লিয়াকত জানতো তাহলে তারা এটা নিয়ে সময় নষ্ট করতো না। লিয়াকতকে তার গুপ্তচর জানায় ওরা বেশিক্ষণ রেস্টুরেন্টে ছিল না। কিছুক্ষণ কথা বলে দুজন বের হয়ে গেছে। কেউ কিছু খায়নি। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। সাজু বললো , - আমি বাসায় গিয়ে রাবেয়ার সঙ্গে আবার কথা বলে নেবো৷ অবশ্য রাত অনেক হয়ে গেছে , এতো রাতে কল দিয়ে কথা বলার চেয়ে কালকে নাহয় কথা হবে। - ডাক্তার সাহেবের এইটা কি করবো? তার অবস্থা তো ভালো না। আমার মনে হচ্ছে আমরা একদম অন্ধকার গুহায় বসে আছি। চারিদিকে বিন্দু পরিমাণ আলো নেই। সাজু হাসলো। যে হাসির অর্থ- সবাইকে তোর মতো মাথামোটা ভাবিস বন্ধু। মুখে বললো , - আমরা গুহার ভেতর নয়। সামান্য একটু অন্ধকার গলিতে আছি। কিন্তু তোর চোখে কালো সানগ্লাস তাই তুই কিছুই দেখতে পাচ্ছিস না। লিয়াকত হাসিমুখে বললো , - তারমানে তুই দেখতে পাচ্ছিস তো? তাতেই হবে৷ তুই গন্তব্য খুঁজে পেলে আমি তোর লেজ ধরে আমিও সেখানে পৌঁছে যাবো। - তোকে দুপুরবেলা যতগুলো মেসেজ করেছিলাম সেখানে কিছু কোম্পানির নাম ছিল। সেগুলোর ডিটেইলস বের করেছিস? - ওটাও আরেকজনের দায়িত্বে ছেড়ে দিছি। তবে আমি নিজেও কিছু তথ্য সংগ্রহ করছি। লিয়াকতের কাধে হাত রেখে সাজু আস্তে আস্তে বললো , - সাইমুন তার কাজের বিষয় খুব সিরিয়াস ছিল। ওই কাজটা থেকে সে যেন সরে যায় এজন্য তাকেও ডাক্তারের মতো মোটা অংকের টাকা অফার করা হয়েছিল। কিন্তু সাইমুন সৎ থাকার কারণে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। - আরে বাপরে, কি বলিস? - এটুকু সাইমুনের কাছেই শুনেছিলাম আমি। আর সেজন্য তোকে ওসব খোঁজ খবর নিতে বলেছি৷ - তাহলে তো আরেকটু গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চারিদিকে কতটা কাজ বন্ধু। শহরের মধ্যে তো একটা মামলা নিয়ে পড়ে থাকা যায় না। প্রতিদিন অসংখ্য অপরাধ হচ্ছে। তবুও ওসি স্যার আমাকে বলেছেন আমিই যেন এই মামলাটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারি। - অবশ্যই গুরুত্ব দিবি , ক্ষুদ্র থেকে অতি সাধারণ সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে দেখবি তাহলে চোখের সামনে গুহার অন্ধকার মনে হবে না। মিটিমিটি আলো চোখে পড়বে। সাজু আবারও অন্তরার কাছে এগিয়ে এলো। ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী আপাতত চেয়ারে বসে আছে। সাজু ও লিয়াকত যখন কথা বলছিল তখন এক ডাক্তার এসে অন্তরার সঙ্গে কথা বলে আবার চলে গেছে। সাজু বললো - কি বললেন ডাক্তার? - অবস্থার অবনতি হচ্ছে। আইসিইউতে নিতে হবে। অন্তরার চোখে পানি , মামার নিদারুণ কষ্টে সে নিজেও খুব ভেঙ্গে পড়ছে। সাজু বললো৷ - ডাক্তার সাহেবের আর কোনো আত্মীয় স্বজন আসেনি? ওনার তো সন্তান নেই৷ কিন্তু বাকি আর কে কে আছে এখানে? - অনেকেই আছে, মামার এক বন্ধু আছে এখানে। মামা তো ডাক্তার , সেজন্য কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সময় যদি ফুরিয়ে যায় তাহলে তো হাজার মানুষ দিয়েও কাজ হবে না তাই না সাজু ভাই? এতো টাকাপয়সা সবকিছু তুচ্ছ। এটা সাজুর চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। সাজুর মা মারা গেল ক্যান্সারে। মায়ের মুখটা তার মনে পড়ে না। কিন্তু মায়ের অনেক আদর করার কথা সাজু মনে করতে পারে। সাজুর বাবা লন্ডনে থাকতো , দাদা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। টাকাপয়সা জমিজমা কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু তার মা'কে কিছুতেই তারা আটকে রাখতে পারলো না। সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে বড় নিয়ম- সময় ফুরিয়ে গেলে চলে যেতেই হবে। হাসপাতালে আর তেমন কাজ রইল না। ডাক্তার সাহেবের সাথে কথা বলতে পারলে ভালো হতো কিন্তু এখানকার ডাক্তার সেটা এলাউ করবে না। কাজেই এখান থেকে চলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। অন্তরার দিকে তাকিয়ে সাজু বললো , - আপনি যদি সকালে আমার সঙ্গে মিথ্যা না বলতেন তাহলে আপনার মামার এরকম পরিস্থিতি না-ও হতে পারতো। আমি তার সাথে কথা বলতাম, অনেক কিছু জানতে পারতাম। তিনি কাদের হয়ে কাজটা করলেন। কেন করলেন সবকিছু জানা যেত , আপনার একটা মিথ্যা কথার কারণে এতগুলো বিপদ হয়ে গেল। - স্যরি সাজু ভাই। - এরপর থেকে আর বিন্দু পরিমাণ কথা লুকানোর চেষ্টা করবেন না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষের সঙ্গে মিথ্যা বলা বন্ধ করবেন। লিয়াকত আলীকে নিয়ে সাজু হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেল। চারজন পুলিশ সেখানে পাহারায় রাখা হয়েছে। বলা তো যায় না- কখন আবার কে আক্রমণ করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাজু মোবাইল হাতে নিয়ে রাবেয়ার নাম্বারে একটা টেক্সট পাঠালো, “ যদি জেগে থাকেন তাহলে রিপ্লাই করবেন। খুব জরুরি ” __________________ সাজু যখন বাসায় ফিরলো তখন হাসান সবেমাত্র ডিনার শেষ করেছে। হাত ধোয়ার আগেই কলিং বেল বেজে ওঠে। তাসনীম গিয়ে দরজা খুলে দিলে সাজু এসে হাসানকে দেখে অনেকটা খুশি হয়ে যায়। হাসান ভাই বললেন , - গোয়েন্দা সাহেব নাকি? এতো রাত পর্যন্ত বাসার বাহিরে থাকলে বউ কিন্তু ঘরে ঢুকতে দেবে না। - সেজন্যই তো বিয়ে করি না। - হাহাহা হাহাহা , কথার পিঠে কথা দিয়ে টুং করে আঘাত দিলা। - একটা বিষয় মাথা থেকে যাচ্ছে না। আপনি জেগে আছেন তাতে ভালোই হলো। নাহলে আমিই এখন আপনাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতাম। - কেন কি হয়েছে? মামলার কোনো সূত্র পাওয়া যাচ্ছে না? - সূত্র পাওয়া গেছে। যতটুকু এগিয়েছি তাতেই প্রকাশ করার সময় হয়ে গেছে। কিন্তু আরেকটা বিষয়ের গভীরতা না জেনে আসল ঢিল ছুড়তে পারছি না। হাত ফসকে বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। - ঘটনাটা আমি অনেকটাই জানি। আজ একজনের কাছে শুনলাম। তোমার কাকে কাকে সন্দেহ হচ্ছে? - সন্দেহ নয় , আমি মোটামুটি নিশ্চিত সাইমুনের স্ত্রী নুড়ি ও তার ছোটবোনের হত্যাকাণ্ড পারিবারিক কোনো কারণে হয়নি। এটা অফিসিয়াল কারণে হয়েছে। - কিরকম? - প্রথমত নুড়ি নামের যে মেয়েটা মূল টার্গেট ছিল সেই মেয়েটাকে প্রায় দুই মাস ধরে মিথ্যা ব্রেইন ক্যান্সারের আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। - আচ্ছা তারপর? - ক্যান্সারের বিষয়টা সম্পর্কে সফল হতে না পেরে চক্রান্তকারীরা উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি নুড়িকে খুন করায়। - কিসের সফলতা? - পরিকল্পনার। - পরিকল্পনাটা কি? - ভাইয়া একটা বিষয় মনোযোগ দিয়ে ভাবলে আপনি বুঝতে পারবেন। নুড়িকে মিথ্যা ক্যান্সার আক্রান্ত সাজানোর জন্য ডাক্তারকে কয়েক লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। এমন কারণে কেউ লাখ টাকা কখন খরচ করে? - যখন সেখানে কোটি কোটি টাকা আয় করার সুযোগ থাকবে। - এক্সাক্টলি সেটাই হয়েছে। সাইমুন তার অফিসের একটা প্রজেক্টের দায়িত্বে ছিল। প্রজেক্টটা সফল কোম্পানির প্রায় দ্বিগুণ টাকা লাভ হতো। কিন্তু নুড়ির মৃত্যুর কারণে সাইমুন সবকিছু বাদ দিয়ে ঢাকায় ফিরে আসে। আর কোম্পানির পঞ্চান্ন কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। - এতো টাকা? - জ্বি ভাই, উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি নুড়িতে হত্যা করার প্রধান কারণ এটাই হবে। খুনিরা চাইলেই সাইমুনকে হত্যা করাতে পারতো কিন্তু সেটা করলে সরাসরি সন্দেহ তাদের দিকে যেত। তাই কৌশলে সাইমুনের স্ত্রীকে টার্গেট করেছে কারণ সাইমুন তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসে৷ স্ত্রীর কিছু হলে সাইমুন পৃথিবীর সবকিছু ভুলে যাবে। - মামলা তো তাহলে প্রায় সমাধান হয়ে গেছে। এবার কোম্পানি গুলো ভালো করে খোঁজ নিলে আসামি খুঁজে বের করা যাবে। - কাজটা কারা করিয়েছে এতটুকু বের করা যাবে। কিন্তু ওই বাসায় এসে বাহির থেকে কে খুন করে গেল? যদি কোনো কন্ট্রাক্ট কিলার দিয়ে কাজটা করানো হয় তাহলে তাকে বের করাই তো সবচেয়ে মুশকিল হয়ে যাবে। - আরে চিন্তা করো না। মনোযোগ দিয়ে চালিয়ে যাও , যারা মূল ষড়যন্ত্রকারী তাদের বের করো , তারপর বাকিটা পুলিশ বুঝে নেবে৷ - ঠিক আছে ভাই৷ আপনি তাহলে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। বিকেল থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি। মনে হচ্ছে হিমুর মতো হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তায় গিয়ে হাঁটাহাঁটি করি। হাহাহা হাহাহা। মোবাইল হাতে বেলকনিতে বসে আছে সাজু ভাই। রাস্তায় মাঝে মাঝে দু একটা বাইক আবার প্রাইভেট কার দেখা যাচ্ছে। মামলার বিষয়টা মাথা থেকে বের করে সাজু মোবাইলে ফেসবুকে ঢুকলো। ফুটবল খেলার একটা ভিডিও ক্লিপ দেখে সেটা ওপেন করলো৷ তারপর আনমনে আঙ্গুল একটার পর আরেকটা ভিডিও দেখতে লাগলো। হঠাৎ একটা ভিডিও দেখে সাজু চমকে উঠল। ভালো করে নজর দিয়ে দেখলো। একটা বাড়ির ছাদে গভীর রাতে শুটিং হচ্ছে। বিয়ে জাতীয় কোনকিছুর জন্য বিশাল সেট সাজানো হয়েছে। নাটকের কিছু পরিচিত মুখ অভিনয়ের জন্য সেখানে প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দৃশ্যই ধারণ করে ভিডিওতে আপলোড করা হয়েছে। ক্যামেরার পিছনে যিনি ছিলেন তার মুখে শোনা যাচ্ছে৷ “ এইযে আমাদের শুটিং সেট। দেখুন কতো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। আপনাদের জন্য আবার অসাধারণ একটা নাটক নিয়ে হাজির হবো খুব শীঘ্রই। ” সাজু বারবার সেই ভিডিওটা দেখলো। তারপর ভিডিওটা সেইভ করে দু-চোখ বন্ধ করে নুড়ি খুন হবার সেই রাত থেকে এখন পর্যন্ত ঘটমান সকল ঘটনা ভাবতে লাগলো। _______________________ সকাল আটটা। আসলাম ফরাজির ছয়তলা ভবনের পাশেই যে চার তলা ভবন। সেই ভবনের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল এটা একটা শুটিং হাউজ। এখানে বিভিন্ন নাটক , সিনেমার শুটিং করা হয়। উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি রাত দশটার দিকে কোনো শুটিং চলছিল কি-না সেটা জিজ্ঞেস করাতেই লোকটা একটু ভেবে বললো , - ওইদিন প্রাঙ্ক কিং টিমের নাটকের শুটিং চলছিল। রাত দশটার দিকে কি ছাদে কোনো কাজ হচ্ছিল? - বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান এমন কিছু। - হ্যাঁ হইছিল তো , কিন্তু কেন ভাই? - আপনাদের পাশের বিল্ডিংয়ে ওই রাতে তিনটা খুন হয়েছে জানেন নিশ্চয়ই? - হ্যাঁ শুনেছি। - আমি সেটার তদন্ত করছি তাই আপনার কাছে এতকিছু জিজ্ঞেস করলাম। আমি কি একটু ছাদে গিয়ে দেখতে পারি? - হ্যাঁ অবশ্যই। সাজু ছাদে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে এদিক ওদিক তাকিয়ে সবকিছু দেখে নিল। ছাদে দাঁড়িয়ে মনে মনে হিসাব করলো। ‘তারা যখন আসলাম ফরাজির বাড়ির ছাদে যায় তখন এই ছাদে কেউ ছিল না। সম্ভবত ততক্ষণে শুটিং শেষ হয়ে গেছে। ছাদ থেকে নেমে বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে পকেট থেকে মোবাইল বের করে লিয়াকতের কাছে কল দিল। লিয়াকতকে বলে দিল সে যেন এখনই হাসপাতালে উপস্থিত হয়। সাজু পৌঁছানোর আগেই লিয়াকত পৌঁছে গেল। পাহারারত পুলিশের কাছে কল দিয়ে আগেই জানা গেছে অন্তরা হাসপাতালেই আছে। সাজু ও লিয়াকত দুজন মিলে অন্তরা ও ডাক্তার সাহেবের বউ যেখানে ছিল সেখানে চলে গেল। কিন্তু সেখানে আরো তিনটা পরিচিত মুখ দেখে অবাক হয়ে গেল। আসলাম ফরাজি , তার স্ত্রী ও বড় মেয়ে রাবেয়া সবাই সেখানে উপস্থিত। সাজু অন্তরার দিকে তাকিয়ে বললো , - কেমন আছেন অন্তরা? - জ্বি ভালো আছি সাজু ভাই , আপনারা কেমন আছেন? - আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনাকে একটা ভিডিও দেখাতে এতো কষ্ট করে ছুটে এলাম। - কিসের ভিডিও সাজু ভাই? সাজু তার পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে গত রাতে ফেসবুকে দেখা ভিডিওটা অন্তরার সামনে প্লে করলো। লিয়াকত কিছুই বুঝতে পারছে না। হঠাৎ দেখলো অন্তরার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যাচ্ছে। আর অন্তরা সাজুর মোবাইলে দেখতে পাচ্ছে, একটা ছাদের উপর অনেকগুলো মানুষ শুটিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর সেখানে ক্যামেরার সামনে থেকে হেঁটে যাচ্ছে সে নিজেই। সাজু ভাই বললেন , - উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি রাত দশটার একটু পরে আসলাম ফরাজির বাড়ির ঠিক পাশের বাড়ির ছাদে আপনি কি করছিলেন? চলবে…

উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি -- [৭]

সাজু তখনও মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। রাবেয়া চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিল। এরকম সময় সচারাচর রেস্টুরেন্টে মানুষ কম থাকে। বিকেল থেকে মানুষের পরিমাণ বাড়তে থাকে। 

- তারমানে আপনি বলতে চাচ্ছেন খুনের সঙ্গে আপনার বয়ফ্রেন্ড সাকিব জড়িত আছে?

মোবাইল সাইডে রেখে রাবেয়াকে প্রশ্ন করলো সাজু ভাই। 

- যেহেতু সে আগেই এরকম পরিকল্পনা করেছে তাই সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আপনি চাইলে তাকে কেন্দ্র করে তদন্ত করতে পারেন। জানিনা কতটা সফল হবেন। তাছাড়া...

- তাছাড়া কি? 

- সাকিব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জড়িত। আপনার জন্য ওর নাগাল পাওয়া কষ্টকর হবে। 

- এরকম একটা মানুষ আপনার বয়ফ্রেন্ড ছিল? 

- সম্পর্ক আসলে কেমন সেটা বোঝাতে পারবো না। আমার মনে হয় নুড়ি ভাবি আমাদের বাসায় ভাড়া থাকে এটা জানার পরে সে ইচ্ছে করে আমার পিছনে লেগেছিল। 

- কতদিনের রিলেশনশিপ ছিল আপনাদের? 

- সাড়ে তিন মাসের মতো। তারপর তো সে নিজের কথা বলে। আমি সরাসরি তাকে নিষেধ করি। 

- আপনি এ কথা কাউকে বলেন নাই? সাইমুন বা তার স্ত্রী এদের জানান নাই যে তাকে খুন করার জন্য কেউ সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছে। 

- নাহ, আগেই বলেছি সাকিব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমার ছোটবোন৷ সাকিব বলছিল যে আমি যদি এসব কাউকে বলি তাহলে আমার বোনের ক্ষতি হবে। 

- কিন্তু এখন যে বলে দিলেন? ভয় হচ্ছে না? 

- নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে। শুধু মনে হচ্ছে আমি যদি আগে তাদের বলতাম তাহলে তারা সতর্ক হতে পারতো। 

- সাকিবের সঙ্গে কিসের শত্রুতা সেরকম কিছু জানেন? কিছু কি বলেছে আপনাকে? 

- না বলেনি। আমি জানার জন্য অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু জানতে পারিনি। আশা করি আপনি তদন্ত করলে সবকিছু জানতে পারবেন। 

- ঠিক আছে , এতটুকু তথ্য জানানোর জন্য ম্যালা ম্যালা ধন্যবাদ। 

ডিবি অফিসার হাসানের পাঠানো তথ্যের উপর আর কোনো প্রশ্ন করেনি সাজু ভাই। কারণ প্রথম মেসেজ পাঠানোর পরে আবার আরেকটা মেসেজ দিয়েছিল হাসান। সেখানে লেখা ছিল ,

“ দিয়াবাড়ি নয় , প্রিয়াঙ্কা সিটি। প্রথমে লোকেশন সেরকম বোঝা যাচ্ছিল না। সম্পুর্ন এরিয়া দেখা যাচ্ছিল। ”

সাজু বুঝতে পারছিল ডাক্তারের বাসায় বড়সড় কোনো গন্ডগোল নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু প্রখর রোদে আর কোথাও যাবার মতো শক্তি পাচ্ছিল না। বাইক নিয়ে সরাসরি বাসায় চলে গেল। 

ভাবি তাকে দেখে অবাক হয়ে বললো , 

- তুমি বাসায় আসছো? আমি তো ভেবেছিলাম আসামি না ধরা পর্যন্ত আর বাসায় ফিরবে না। 

ধপাস করে সোফায় বসে শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে সাজু বললো , 

- শরীরটা তেমন ভালো না ভাবি। বাহিরে রোদে বেশিক্ষন থাকতে পারি না। কি যে হলো! 

- এখানে না বসে রুমে গিয়ে রেস্ট নাও৷ তার আগে খাবার দিচ্ছি, খাবার খেয়ে নাও। 

হাসানের বউয়ের নাম তাসনীম। দীর্ঘ ১৩ বছরের বিবাহিত জীবনে এখনো তাদের কোনো সন্তান হয়নি। দুজনেই ভালো ডাক্তার দেখালো কিন্তু কারো কোনো সমস্যা ধরা পড়লো না। তবুও কেন যে আল্লাহ তাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন কেউ জানে না। হাসানের সঙ্গে সাজুর রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। খুলনার খালিশপুরে থাকাকালীন সময়ে প্রথম পরিচয় হয়েছিল। 

ঢাকার এই বাসায় সাজুর একটা রুম সবসময় বরাদ্দ করা থাকে। সাজু যেন হাসান বা তাসনীম এদেরই কারো আপন ভাই। 

সাজু ফ্রেশ হয়ে অজু করে এসে জোহরের নামাজ শেষ করলো। তাসনীম ততক্ষণে খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। খাবার খেয়ে রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে লিয়াকতের কাছে কল দিল সাজু ভাই। কল রিসিভ হতেই সাজু বললো , 

- আমি বাসায় আসছি , কিছুক্ষণ ঘুমাবো। তুই কি প্রিয়াঙ্কা সিটিতে ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদের বাসার সামনে কাউকে টহলে রাখতে পারবি? 

- কেন পারবো না? এখনই তিন চারজন পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

- তিন চারজন নয় , একজনকে পাঠাবি। কিন্তু সে যে ওখানে নজরদারি করবে এটা যেন কেউ বুঝতে না পারে। 

- গুপ্তচর নাকি? 

- সেরকমই। 

- আচ্ছা তাহলে বিষয়টা থানার কাউকে দিয়ে করাবো না। আমার কিছু লোকজন আছে ১৪ নাম্বার সেক্টরের ওখানে। ওদের দিয়ে করবো। 

- ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখবি কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

- চিন্তা করিস না৷ কাজ হয়ে যাবে। 

- আরেকটা কাজ আছে। 

- কি কাজ? 

- সাকিব নামে একটা ছেলের এড্রেস দিচ্ছি। ওই ছেলের বিষয় খোঁজ খবর নিয়ে রাখ তো। ছেলেটা আসলাম ফরাজির বড় মেয়ে রাবেয়ার বয়ফ্রেন্ড ছিল। 

- রাবেয়ার বয়ফ্রেন্ডের খোঁজ নিয়ে কি হবে? 

- রাবেয়া বলছিল ওই সাকিবের সঙ্গে নাকি নুড়ির পুরনো কোনো শত্রুতা ছিল। 

- সাংঘাতিক ব্যাপার তো। 

- পারলে তুই নিজে খোঁজ নিবি। ছেলেটা সম্ভবত রাজনীতির সাথে জড়িত আছে। রাখি তাহলে। 

মোবাইল রেখে সাজু চোখ বন্ধ করলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সে ঘুমিয়ে পড়লো৷ সাজুর সেই ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যার খানিকটা আগে। শরীরে তাপমাত্রা বেড়েছে খানিকটা , পেট আর বুকের মধ্যেও ব্যথা হচ্ছিল। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো সেখানে লিয়াকতের তেমন কোনো আপডেট নেই। তবে একটা মেসেজ সে পাঠিয়েছে। 

“ বাড়ির সামনে আমার এক লোক একটা ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইট বোঝাই করে সেখানে গিয়ে পরে ইঞ্জিন বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। সবার কাছে বলেছে ইঞ্জিন নষ্ট হয়েছে তাই সারাতে সময় লাগবে। সে ওখানেই আছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেরকম সন্দেহের কিছু পায়নি। ”

ওয়াশরুমে সাজু গড়গড় করে বমি করলো। বুকের ব্যথা খানিকটা কমলো। হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় এসে আবার ঘুমিয়ে গেল। 

এবার তার ঘুম ভাঙলো রাত এগারোটার দিকে। আর সেটা এসআই লিয়াকতের কল পেয়ে। 

বিছানা হাতড়ে মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুম ঘুম চোখে কল রিসিভ করলো। ওপ্রান্ত থেকে লিয়াকত বেশ আতঙ্কিত হয়ে বললো , 

- সাজু, ডাক্তার সাহেব এখন হাসপাতালে। তাকে কে যেন তার বাসাতেই হত্যার চেষ্টা করছিল। এখনো বেঁচে আছে , ডাক্তাররা চেষ্টা করছে। এখন বর্তমানেে উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি আছে। 

ধড়ফড়িয়ে সাজু বিছানায় বসলো। 

বললো ,

- কীভাবে কি হয়েছে ভালো করে বল তো? 

- রাত নয়টার দিকে বাড়িতে একটা অপরিচিত ছেলে প্রবেশ করে। অনলাইনে খাবার ডেলিভারির নাম করে দারোয়ানকে বলে ভিতরে যায়। 

- আচ্ছা তুই এখন কোথায়? 

- আমি হাসপাতালে আছি। 

- ঠিক আছে আমি আসতেছি। 

কয়েক ঘন্টার ঘুমে শরীর খানিকটা ভালো। তবে দুর্বলতা যাচ্ছে না। তবুও ভাবিকে বলে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল সাজু। 

সাত নাম্বার সেক্টরে উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল বা অনেকের কাছে বাংলাদেশ মেডিকেল নামেও পরিচিত। হাসপাতালে গিয়ে সবার আগে এসআই লিয়াকতের সঙ্গে দেখা করে। অদুরেই দাঁড়িয়ে আছে ডাক্তার সাহেবের ভাগ্নি। সাজু লিয়াকতের কাছেই প্রশ্ন করলো ,

- এখন কি অবস্থা? 

- ডাক্তার বলছে ভয়ের আশঙ্কা নেই। 

- চারিদিকে পুলিশ পাহারায় আছে তো? নাহলে শত্রু এখানেও আক্রমণ করতে পারে। 

- কিছু হবে না, কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। 

সাজু এবার ডাক্তার সাহেবের ভাগ্নির দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটার পাশের আরেকজন মাঝবয়সী মহিলা কাঁদছে। আনুমানিক মহিলাটা ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী হতে পারে। 

- আপনি যতটুকু জানেন বা দেখেছেন সবটুকু বলেন। 

চোখে চোখ রেখে অভয় দিয়ে সাজু বললো। 

- আমি আমার রুমের বেলকনিতে ছিলাম। মামা ড্রইং রুমে টিভি দেখছিলেন। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ পাই। যেহেতু মামা ড্রইং রুমে ছিল তাই আমি আর বেলকনি থেকে বের হইনি। পাঁচ মিনিট পর মামির চিৎকার শুনে দৌড়ে এলাম। এসে দেখি মামা অচেতন অবস্থায় দরজার সামনে পড়ে আছে। মামার মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছে। আর মামি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মামার ডানপাশে দরজার কাছেই একটা পিৎজা পড়ে আছে। 

পাশ থেকে লিয়াকত বললো , 

- যে ছেলেটা ডেলিভারি করতে এসেছে সেই ছেলে কাজটা করেছে সাজু। সম্ভবত পিৎজা হাতে নিয়ে টাকা দেবার জন্য মানিব্যাগের দিকে মনোযোগ দিয়েছে আর তখনই কিছু একটা করেছে।

- হতে পারে। 

সম্মতি দিল সাজু ভাই।

- আরেকটা কথা ছিল সাজু ভাই। 

আমতা-আমতা করে অনুমতি চাচ্ছে তাবাসসুম। 

- জ্বি বলেন। 

- আমার ডাকনামই অন্তরা। আজ সকালে আমিই আপনাকে কল করেছিলাম। আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় সেখানে মামা চলে আসে। আমার হাত থেকে মামা-ই মোবাইল কেড়ে নেয়।

সাজু ও লিয়াকত দুজনেই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। লিয়াকত বললো ,

- তাহলে সাজু যখন আপনার মামার বাসায় দ্বিতীয়বার গিয়ে জিজ্ঞেস করলো তখন সবকিছু গোপন করলেন কেন? 

- নুড়ি নামের সেই মেয়েটার মিথ্যা ক্যান্সার রিপোর্ট সাজানো আর সবকিছু ঠিকঠাক ম্যানেজ করার জন্য মামা ওদের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা নিয়েছে। 

- সামান্য একটা কাজের জন্য এতগুলো টাকা?

সাজু বললো , 

- আমার সঙ্গে কথা বলার সময় আপনার কাছ থেকে যখন মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয় তখন আপনি একটা শব্দ বলেছিলেন। “ কে আপনি ”? লোকটা যদি আপনার মামা হয় তাহলে আপনার তাকে চিনতে পারেন নাই কেন?

- পিছন থেকে মোবাইল নিয়েছিল তাই অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে গেছিল। কিন্তু যতক্ষণে বুঝতে পারলাম ওটা আমার মামা ততক্ষণে তিনি মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে।

- তারপর কেন বলেন নাই? কেন মিথ্যা নাটক করে সাজুকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেন?

প্রশ্ন করলো লিয়াকত আলী। 

- মামার কোনো সন্তান নেই , আমার মা-বাবা দু'জনেই আলাদা হয়েছে আমার ছোটবেলায়। তারা দুজনেই আলাদা আলাদা বিয়ে করে নতুন সংসার নিয়ে সুখে আছে। মামা আমার বিয়ে ঠিক করেছে সপ্তাহ খানিক আগে। কিন্তু আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করি। মামা সেই ছেলেকে মেনে নিতে রাজি নয়। 

লিয়াকত বিরক্ত হয়ে বললো৷ 

- এসব আমরা জেনে কি করবো? 

সাজু লিয়াকতকে থামিয়ে দিয়ে অন্তরাকে বলার জন্য ইশারা করেন। 

- ছাদে দাঁড়িয়ে মোবাইল কেড়ে নিয়ে মামা বলে , “তারমানে তুই সব জানিস তাই না? ওকে ফাইন, তোর সামনে দুটো পথ খোলা আছে। প্রথমত তুই তোর পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে পারবি। তার বিনিময়ে তোকে ওই ডিটেকটিভের সামনে মিথ্যা অভিনয় করতে হবে। ”

- আর দ্বিতীয় পথ কি ছিল? 

- বলেছিল , আমি যদি সবকিছু জানিয়ে দেই তাহলে ওই লোকগুলো মামাকে, আমাকে, সবার ক্ষতি করবে। সেজন্য আমি বাধ্য হয়ে তখন মামার সঙ্গে বাসায় এসে আপনি আসার পরে ওরকম মিথ্যা কথা বলেছি। 

এসআই লিয়াকত তখন সাজুকে কথার মাঝখানে হাত ধরে টেনে এক সাইডে নিয়ে গেল। 

সাজু বললো ,

- কি হয়েছে?

লিয়াকত তার মোবাইল বের করে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে কয়েকটা ছবি দেখালো।। ছবিতে দেখা যাচ্ছে , একটা রেস্টুরেন্টে রাবেয়া ও আরেকটা ছেলে বসে আছে। ছবিগুলোর মধ্যে ১৭ সেকেন্ডের একটা ভিডিও আছে। দুজন কোনো বিষয় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে কথা বলছে। 

লিয়াকত বললো , 

- এটাই সেই সাকিব। তুই দুপুরের পরে সাকিবের খোঁজ খবর নিতে বলার জন্য আমি এর পিছনেও একজন স্পাই লাগিয়ে রেখেছিলাম। কিছুক্ষণ আগে সে ছবিগুলো পাঠিয়েছে। 

সাজু বললো , 

- রাবেয়া আবার সাকিবের সঙ্গে কেন? 

- এদের মধ্যেও কোনো ঝামেলা আছে। সবদিক শুধু ঝামেলা, কোই যাবো আমি? 

লিয়াকতের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সাজুর মোবাইলে সাইমুনের কল এলো। 

.

.

লাইক কমেন্ট করে নিজের হাজিরা দিয়ে যাবেন। 

.

চলবে...

উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি - ৬

 সাজু ভাই বাসার সামনে এসে বাইক থামিয়ে দারোয়ানকে গেইট খুলতে বললো। দারোয়ান সামান্য অবাক হয়ে বললো ,

- আপনি না একটু আগে গেলেন?
- হ্যাঁ , কিন্তু আরেকটা জরুরি কাজ বাকি রয়ে গেছে তাই আবার এসেছি।

দারোয়ান কিছু না বলে গেইট খুলে দিল। যেহেতু খানিকক্ষণ আগেই এরা এসেছিল তাই ডাক্তারের কাছ থেকে অনুমতিরও দরকার মনে করলো না। সাজু গেইট দিয়ে প্রবেশ করে সরাসরি ডাক্তারের ফ্ল্যাটে চলে গেল।
কলিং বেল বাজতেই মেয়েটা এসে দরজা খুলে দিল৷ সাজুকে দেখে হাসতে হাসতে বললো ,
- আরে সাজু ভাই আপনি আবার এসেছেন? কিছু ফেলে গেছেন নাকি?
সাজু কিছুটা চিন্তার মধ্যে পড়ে গেল। কল দিয়ে মেয়েটা তার নাম বলেছিল অন্তরা। আর তখন তার সাথে শেষ মুহূর্তে অস্বাভাবিক কিছু শুনতে পেয়েছে। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের ভাগ্নি এই মেয়ের মধ্যে তো সেরকম কিছু দেখছে না।
সাজু বললো ,
- আপনি কি একটু আগে আমাকে কল করেছেন?
সাজুর প্রশ্নে মেয়েটা যেন আকাশ থেকে পড়ছে। চোখ কপালে তুলে বললো ,
- আমি? কোই না তো, আপনার নাম্বার তো নাই আমার কাছে। তাছাড়া আপনি একটু আগেই এখান থেকে বের হয়েছেন। কল কেন দেবো?
সাজু যেন নিজেকে নিজে বিশ্বাস করতে পারছে না। মোবাইল হাতেই ছিল , কললিস্ট থেকে সেই নাম্বারে আবার কল দিল। নাম্বার বন্ধ।
সাজু ভাই নাম্বারটা মেয়েটার দিকে দেখিয়ে বললো ,
- এই নাম্বারটা চিনতে পারেন নাকি দেখেন তো।
মেয়েটা ভালো করে সেটা দেখলো। তারপর সাজুর দিকে তাকিয়ে রইল। বললো ,
- না সাজু ভাই , আমি তো চিনি না।
সাজু চুপচাপ কিছু ভাবতে লাগলো। সাজুর এমন নীরবতা দেখে মেয়েটা বললো ,
- কোনো সমস্যা হয়েছে সাজু ভাই?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সাজু বললো ,
- নাহ তেমন কিছু নয় , আপনার নামটা জানতে পারি?
- অবশ্যই , আমার নাম তাহিয়া তাবাসসুম।
- ওহ্ আচ্ছা , ঠিক আছে তাবাসসুম আমি তাহলে আসি৷ পরে আবার কথা হবে।
বিদায় নিয়ে সাজু অনেকটা চিন্তিত হয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। রাস্তায় নেমে বাইকে বসে রাস্তায় চলতে চলতে শুধু ভাবছে কলটা কার ছিল?
বাইক চালিয়ে সাজু সরাসরি আজমপুরে চলে এলো। এসআই লিয়াকতকে কল দিতেই সে বের হয়ে এলো। দুজন মিলে রাস্তার পাশের একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল।
সবকিছু শুনে লিয়াকত বললো ,
- মানুষ বলে না অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। আমার তো মনে হয় সাইমুনের মধ্যে কোনো ঝামেলা আছে।
- থাকতেও পারে।
উদাস হয়ে উত্তর দিল সাজু।
- এদিকে শুধু শুধু ওই বাসার ছাদের চিলেকোঠার দু'জনকে ধরে নিয়ে এসেছি। আসার পর থেকে ননস্টপ কান্না করতেছে৷ ওসি সাহেব তো বিরক্ত হয়ে বলছে এদের তাড়াতাড়ি চালান করে দাও।
- তুই কোনো জিজ্ঞেসাবাদ করিস নাই?
- করেছি না আবার। কোনো জবাব নেই , কোনো কথা নেই। শুধু বলে, আমরা কিছু করি নাই। আমরা নির্দোষ।
- সাইমুন যে অফিসে চাকরি করে সেই অফিসের ঠিকানা আছে? একটু দেখা করতে চাচ্ছিলাম।
- হ্যাঁ আছে তো, সেই মেয়েটা নিজেই তো ঠিকানা দিয়ে গেল। কিন্তু ওই ডাক্তারের কি করবি? তাকে তো সন্দেহের তালিকায় রাখা দরকার।
- তোকে যে বলেছিলাম ওই বাসায় গিয়ে নুড়ির সব পুরনো টেস্ট রিপোর্ট কালেক্ট করতে। সেগুলো এনেছিস?
- ওদের বাসায় কোনো রিপোর্ট নেই। গতকাল রাতেই তো আমরা তেমন কিছু পেলাম না। আমার মনে হয় খুনি সেগুলো নিয়ে গেছে।
- তুই হাসপাতালে কথা বলে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আনার ব্যবস্থা করবি। তখন সবকিছু ওই রিপোর্টেই পাওয়া যাবে।
- একটা কথা বলি দোস্ত।
- বল।
- এই মামলাটা যদি আমি শেষ করতে পারি তাহলে ডিপার্টমেন্টে অনেক সুনাম অর্জন করতে পারবো। ক্যারিয়ার সামনের দিকে এগিয়ে নেবার বড় টার্নিং পয়েন্ট হবে।
- অবশ্যই সম্ভব হবে। চিন্তা করিস না, মনোযোগ দিয়ে কাজ কর। সব হবে ইন-শা-আল্লাহ।
লিয়াকতের সামনে দাঁড়িয়ে সাজু আরেকটা কাজ করে নিল। ডিবি অফিসার হাসানের কাছে কল দিয়ে কিছুক্ষণ আগে যে নাম্বার দিয়ে কল এসেছে সেই নাম্বারটা পাঠিয়েছে। প্রথমে কল করেছিল কিন্তু হাসান কল রিসিভ করেনি৷ একটা টেক্সট পাঠিয়েছে “ ব্যস্ত ”।
সাজু হোয়াটসঅ্যাপে নাম্বারটা পাঠিয়ে নিচে লিখে দিয়েছে ,
❝ নাম্বারটা এখন বন্ধ আছে। বন্ধ হবার আগে এই নাম্বারটার লোকেশন কোথায় ছিল সেটা জানাটা খুব জরুরি। ফ্রী হয়ে আপনার অফিস থেকে যদি কাজটা করে দেন তাহলে খুব ভালো হয়। ❞
যেহেতু কেইসটা এখন পুলিশের কাছে তাই হাসান সরাসরি এখানে জড়িত হতে চাইবে না। এর আগে অনেকবারই সাজু এভাবে টুকটাক তথ্যের জন্য হাসান ভাইয়ের সাহায্য নিয়েছে।
-----------
বাহির থেকে বিল্ডিংটা যেরকম দেখাচ্ছে আসলে ভিতরটা সম্পুর্ণ আলাদা। প্রতিটি জিনিসের দিকে নজর দিলে বোঝা যায় অনেক যত্ন করে সবকিছু সাজানো হয়েছে। রিসিপশনের মেয়েটা সাজুকে বসতে বলে তৃপ্তির কাছে কল দিল।
সাজু ভেবেছিল তাকে হয়তো পিওন ধরনের কেউ এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু তৃপ্তি নিজেই রিসিপশনে চলে আসবে এতটা আশা করেনি।
- কেমন আছেন সাজু সাহেব?
- জ্বি আলহামদুলিল্লাহ , আপনাকে বিরক্ত করতে চলে এলাম। তবে বেশি সময় নষ্ট করবো না।
- কোনো সমস্যা নেই , প্লিজ আসুন।
তৃপ্তি নিজেই সাজুকে নিয়ে তার রুমে গেল। সাজু চারিদিকে তাকিয়ে আরেকবার অবাক হলো। মুখোমুখি বসে তৃপ্তি বললো ,
- কি খাবেন বলেন।
- কিছু খাবো না।
- আপনার ফেবারিট ঠান্ডা কফি নিন! আপনার সঙ্গে সঙ্গে আমিও নাহয় খেলাম।
- তা দিতে পারেন।
কফির অর্ডার দিয়ে তৃপ্তি টেলিফোনে কথা বলতে শুরু করে। কথার ধরেন বোঝা যাচ্ছে বিজনেস রিলেটেড কোনো বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে।
কথার মাঝে কফি এলো। কথা শেষ করে তৃপ্তি বললো ,
- স্যরি।
- সাইমুন সাহেবের সাথে আপনার কথা হয়েছে?
- হ্যাঁ , সকালে একবার কল দিয়ে স্যরি বলছিল। আর কিছুক্ষণ আগে আবার কল দিয়ে বললো আমি তার স্ত্রীর সঙ্গে রাতে কি কি বলেছি এসব।
- সাইমুনের বিষয় আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবো। আশা করি সঠিক জবাব দিবেন।
- অবশ্যই, প্লিজ।
- আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ প্রশ্নগুলো একটু নেগেটিভ মনে হতে পারে।
- সমস্যা নেই আপনি বলুন।
- সাইমুনের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক ছিল? মালিক ও এমপ্লয়ি এর বাইরেও কোনো সম্পর্ক ছিল কি-না সেটা জানতে চাচ্ছি। ধরুন বন্ধুত্ব।
- সেরকম কিছু ছিল না। বরং তার বিষয় আমার কাছে সবসময় একটা নেগেটিভ চিন্তা কাজ করতো। কারণ আমার বাবা একসময় তার সঙ্গে আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
- আপনারা এতো টাকাপয়সার মালিক কিন্তু তবুও আপনার বাবা ওনার মতো সামান্য কর্মচারীর সঙ্গে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন। বিষয়টা ঠিক বুঝলাম না।
- বাবা কেন চেয়েছিলেন সেটা তিনিই বলতে পারবেন। অবশ্য এ নিয়ে বাবাকে আমি কখনো জিজ্ঞেস করিনি।
- সাইমুন কি জানতেন?
- প্রথমে জানতেন না , মাস দুয়েক আগে বাসায় একটা চায়ের নিমন্ত্রনে সাইমুনকে বাবা কথাটা বলেছিল।
- আপনি গতকাল রাতে বলেছিলেন যে সাইমুন আপনাদের একটা বড় প্রজেক্টের কাজ নিয়ে চট্টগ্রামে ছিল। সেখান থেকে নিশ্চয়ই অসমাপ্ত কাজ রেখে তাকে ফিরতে হয়েছে।
- হ্যাঁ , কাজটা সম্পুর্ণ ওনার মাধ্যমে করতে হতো। প্রায় তিনমাস ধরে এই প্রজেক্ট চলছিল। আর দুটো দিন পার হলেই শেষ হতো। কিন্তু সাইমুন সাহেব চলে আসাতে পুরো প্রজেক্ট লস গেল, আমাদের কোম্পানির প্রায় পঞ্চান্ন কোটি টাকা লোকসান হয়ে গেল।
- তাহলে তো অনেক টাকা। কিন্তু সাইমুনের জীবন থেকে যে ঝড়টা গেল তাতে তো তাকে দোষারোপ করা যায় না।
- হ্যাঁ , সবটাই ভাগ্যের ব্যাপার। ব্যবসা করতে এমন লাভ-লস থাকবেই। তবে ওনার অসুস্থ স্ত্রীকে এভাবে কেউ খুন করলো এটা কাম্য নয়। তাছাড়া ওনার স্ত্রীর ছোটবোন অকালে প্রাণ হারালো।
সাজুর ফোনটা বেজে উঠলো৷
এক্সকিউজ মি-বলে সাজু কলটা রিসিভ করে।
- আসসালামু আলাইকুম।
- ওয়া আলাইকুমুস সালাম। সাজু সাহেব, আমি রাবেয়া। গতকাল যে বাসায় খুন হয়েছে সেই বাসার মালিকের বড় মেয়ে। মনে হয় চিনতে পেরেছেন।
- হ্যাঁ চিনতে পেরেছি।
- আমি আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই। এখনই হলে ভালো হয়।
- কোন যায়গা আসবো বলেন।
- দিয়াবাড়ি প্রথম স্টেশন থেকে খানিকটা সামনে গিয়ে বামদিকে কিছুটা যাবার পরে একটা বড় রেস্টুরেন্ট আছে। আমি সেখানেই আছি।
- আপনি থাকুন, আমি আসছি।
তৃপ্তির কাছে বিদায় নিয়ে সাজু বাইক নিয়ে আবার বেরিয়ে গেল। লিয়াকতের কাছে কল দিয়ে বলে দিল সে কোথায় যাচ্ছে। সম্ভবত সাজু ভাই রাবেয়া নামের এই মেয়েটাকেও সন্দেহের মধ্যে রেখেছে।
-----------
সাজু ভেবেছিল ডাক্তারের বাসা থেকে বের হবার পরে যে কলটা এসেছিল সেরকম কোনো হয়রানির কল হতে পারে। যেহেতু একবার মেসেজ এসেছে , একবার কল এসেছে , আবার এখন আরেকটা কল এসেছে তাই এগুলো খুনির চক্রান্ত হিসেবেই বড় করে দেখছে সাজু ভাই।
কিন্তু রাবেয়া সত্যি সত্যি এসেছে। সে এখন সাজুর সামনে বসে আছে। সাজু ভাই বললো ,
- আপনি সম্ভবত কিছু বলতে ডেকেছেন।
- হ্যাঁ , কথাগুলো গতকালই আপনাকে বলা উচিত ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে তখন মা-বাবার সামনে কিছু বলতে পারিনি।
- ঠিক আছে বলুন কি বলতে চান।
- সাইমুন ভাইয়ার স্ত্রী আর আমার এক্স বয়ফ্রেন্ড একসঙ্গে একই ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতো। সাকিবের বেশ কিছু বিষয় নিয়ে নুড়ি ভাবির সঙ্গে ওর ঝামেলা ছিল। সাকিব নুড়ি ভাবিকে খুন করার পরিকল্পনা করেছিল।
সাজু ধরেই নিল রাবেয়ার বয়ফ্রেন্ডের নাম সাকিব।
সে বললো ,
- পরিকল্পনার কথা আপনি জানেন কীভাবে?
- কারণ পরিকল্পনাটা সে আমার সঙ্গেই করেছিল। কিন্তু আমি ওর এমন প্রস্তাবে রাজি হইনি বলে আমাদের ব্রেকআপ হয়েছে।
- আপনি এটা গতকাল বলেন নাই কেন?
বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করলো সাজু ভাই।
- সাজু ভাই, সেখানে আমার মা-বাবা সবাই ছিল। তাছাড়া পুলিশের লোক ছিল অনেক। সবার সামনে আমি এগুলো কীভাবে বলতাম বলেন। আর এইসব ঘটনা আরো চার মাস আগের।
সাজু কিছু বলতে যাবে তখনই সাজুর হোয়াটসঅ্যাপে হাসানের রিপ্লাই আসে।
“ বন্ধ হবার আগে সেই নাম্বারটা উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় ছিল। ”
মেসেজ পড়ে সাজু রাবেয়ার দিকে তাকালো। বললো ,
- আপনি এখানে মানে দিয়াবাড়ি কখন এসেছেন?
- আমি সকালেই এসেছি। এই রেস্টুরেন্টের ক্যাশ কাউন্টারে আমিই বসি।
বিড়বিড় করে সাজু কিছু একটা বলতে লাগলো।
কি বললো ঠিক বোঝা গেল না।
.
.
.
চলবে...

উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি -- ৫

 রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের অপজিট বিল্ডিংয়ের একটা জনপ্রিয় কফিশপে বসে আছে সাজু ভাই। সাজুর সামনে বসে আছে সাইমুন। সাইমুনের চোখ লাল টকটক করছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সারারাত একফোঁটা ঘুম হয়নি। নিজের ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে গেলে মানুষ হারানোর কষ্ট সহজে কি মেনে নিতে পারে? 


- থানায় পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে? 

নীরবতা ভেঙ্গে প্রশ্ন করলো সাজু ভাই। 

- চট্টগ্রাম থেকে ফিরে সরাসরি বাসায় যাই। সেখান থেকে থানায় গেছিলাম। তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, আমার নুড়িকে ওরা হত্যা করলো। অথচ এরা আমার সঙ্গে কতো উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে। 

খানিকটা আফসোসের সহিত বললো সাইমুন। 

- তদন্তের জন্য কতকিছুই তো জিজ্ঞেস করতে হয় সাইমুন সাহেব। তাতে করে আসল অপরাধীকে খুঁজে পেতে সহজ হয়। 

- অপরাধীকে ওনারা গ্রেফতার করেছে। ছাদের চিলেকোঠায় যারা থাকতো তারাই তো আমার নুড়িকে খুন করেছে। 

- তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দেহ করে। সরজমিনে আমরা সবকিছু ঘাটাঘাটি করে তাদের বেশি সন্দেহ করেছি। পুলিশ এখন তাদের আরো ভালো করে জিজ্ঞেসাবাদ করবে। 

- আপনি আমাকে কেন ডেকেছেন? এসআই লিয়াকত স্যার বলছিলেন আপনি নাকি জরুরি কথা বলতে চান। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে সাজু তার বন্ধুর কাছে কল দিয়ে মামলার আপডেট জিজ্ঞেস করে। লিয়াকত আলী জানান , সাইমুন সকাল সাতটার দিকে ঢাকা এসেছে। যশোর থেকে নুড়ির মা-বাবা দু'জনেই এসেছে। তারা সবাই থানায় গিয়ে কথা বলেছে। সাজু ভাই তখন বলেছিল সে সাইমুনের সঙ্গে একাকী একটু কথা বলতে চায়। তবে লিয়াকত চাইলে থাকতে পারে। 

কিন্তু লিয়াকত সেটা করেনি। সাইমুনকে সে সাজুর সঙ্গে দেখা করতে বলেছে। এটাও বলে দিয়েছে স্ত্রীর হত্যার বিচার পেতে হলে কোনকিছু গোপন না করে যেন সাজুর সঙ্গে সব সত্যি বলে দেয়। 

ভোররাতের মেসেজের কথা সাজু কাউকে বলেনি। এরকম নাম-পরিচয় বিহীন কোনো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে কাউকে জানানো বোকামি। 

তাছাড়া মেসেজ আসার পড় থেকে সেই নাম্বারটা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। 

হতে পারে বিভ্রান্ত করার জন্য কেউ পথের দিক পরিবর্তন করে দিতে চাইছে। 

টিস্যু নিয়ে সাইমুন চোখ মুছলো। 

সাজু ভাই বললো , 

- আপনার সঙ্গে আমিও কিছু উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করতে চাই। আশা করি বিরক্ত না হয়ে সেগুলোর জবাব দিবেন। 

- নিজেই যদি মনে করেন সেগুলো উল্টাপাল্টা কথা, তাহলে কেন শুধু শুধু সেগুলো জিজ্ঞেস করবেন। আপনাদের কাউকে বোঝাতে পারবো না আমি নুড়ির জন্য কতটা কষ্ট পাচ্ছি। 

- এতটা কষ্ট তো পাওয়ার কথা নয় সাইমুন সাহেব। কারণ আপনার স্ত্রী তো ব্রেইন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল। সে যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে সেরকম মানসিক প্রস্তুতি তো আপনার ছিল। 

- আমার স্ত্রীর ক্যান্সারের কথা আপনি কীভাবে জানেন? পুলিশ বলেছে? 

- নাহ, আপনার অফিসের বস তৃপ্তি বলেছে। মনে হয় আপনিই তাকে বলেছিলেন এইটা। তাই না? 

- হ্যাঁ বলেছিলাম। প্রতিদিন অফিসে যেতে বিলম্ব হতো তাই সে কারণ জিজ্ঞেস করাতে আমি তাকে পরশু সত্যিটা বলেছিলাম। 

- সত্যিটা নাকি মিথ্যাটা? 

- মিথ্যা কেন বলবো? নুড়ি ক্যন্সারের সঙ্গে লড়াই করছে অনেকদিন ধরে। প্রতিদিন তার অসহ্য যন্ত্রণার কাতরানি আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। কাউকে বলিনি আজও। 

- সাইমুন সাহেব, মনে করেন কোনোভাবে পরীক্ষা করে কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমরা জানতে পারলাম আপনার স্ত্রী মানে নুড়ির কোনো ক্যান্সার ছিল না। তাহলে কি সেটা ভুল হবে? 

- কিসব আজেবাজে কথা বলছেন? নুড়ির ক্যান্সার অনেক দিনের। আমাদের বাসায় ভালো করে তল্লাশি করলে আপনারা ওর সকল মেডিসিন  প্রেসক্রিপশন টেস্ট রিপোর্ট দেখতে পেতেন। 

- আমরা সবকিছুই দেখেছি। আপনি উত্তেজিত হবেন না। আমি আপনাকে মনে করতে বলেছি, পুরোপুরি মেনে নিতে বলিনি। 

সাইমুন কিছু বললো না। সাজু সামনে রাখা ঠান্ডা কফিতে চুমুক দিল। সাইমুনের মনে হচ্ছে তার সামনে যিনি বসে আছে তিনি পৃথিবীতে একমাত্র ঠান্ডা কফি ছাড়া কিছু চেনে না। কারণ এখানে আসার পড় সে চার কাপ কফি খেয়ে ফেলেছে। প্রথম এসে একসঙ্গে চার কাপ ঠান্ডা কফির অর্ডার করতেই সাইমুন চমকে যায়। সে ভেবেছিল তারা দুজন ছাড়া আরো দুজন হয়তো আসবে। কিন্তু পরক্ষণেই সাজু তাকে বলেছিল , 

- নিশ্চয়ই সারারাত কিছু খাওয়া হয়নি। অনেক বেলা হয়ে গেছে, কি খাবেন? 

সাইমুন কিছুই খেতে রাজি হলো না। গতকাল সকালে যে মানুষটা তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছিল। যার হাতের খাবার খেয়ে সে বাসা থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম গেল। সেই মানুষটা আজকে হাসপাতালের মর্গে পরে আছে। 

সাজু আবার বললো , 

- যেখানে পোস্টমর্টেম করা হবে সেখানে আমি বলে দিয়েছি যেন ব্রেইন ক্যান্সারের বিষয়টা ভালো করে পরীক্ষা করা হয়। সুতরাং সত্যিটা জানতে কোনো অসুবিধা হবে না। 

- দেখুন ভাই, আমার নুড়ি ক্যন্সারে আক্রান্ত ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেই ডাক্তার দীর্ঘদিন ধরে ওর চিকিৎসা করছিল। আপনি চাইলে আমার সঙ্গে সেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে কথা বলতে পারেন। 

- আমি তো সেটাই চাচ্ছি। যিনি আপনার স্ত্রীর চিকিৎসা করছিল তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। 

- প্লিজ ভাই। আমার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। আপনারা হত্যাকারীদের প্রমাণসহ গ্রেফতার করুন। সে তো ক্যান্সারে মারা যায়নি, ডাক্তারের কাছে গিয়ে কেন সময় নষ্ট করতে চাচ্ছেন? 

- আমি আপনাকে আগেই বলেছি অযথা সময় নষ্ট করার মতো মানসিকতা আমার নেই। আমার সঙ্গে বাইক আছে, আপনি আমার সঙ্গে চলুন। আমরা দুজন মিলে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবো। 

- ঠিক আছে, চলুন তাহলে। 

খানিকটা অনিচ্ছায় রাজি হলো সাইমুন। 

কফিশপ থেকে বের হয়ে নিচে নামার সময় সাজু ভাই একা একাই বললেন , 

- নিজেকে শান্ত করুন। যা হয়েছে সেটা কখনো পরিবর্তন করা যাবে না। দুঃখ আছে বলেই সুখ এতটা মুল্যবান। 

সাইমুনের কাছে ডাক্তারের নাম্বার সেইভ করা ছিল। তাকে কল দিয়ে জানা গেল তিনি এখন বাসাতেই আছেন। বাসার ঠিকানা নিয়ে তারা দুজন  বাইকে করে উত্তরার ১৪ নাম্বারে সেক্টরের কাছেই প্রিয়াঙ্কা সিটিতে চলে এলো। 

প্রিয়াঙ্কা সিটিতে এখনো পুরোপুরি ভবন নির্মাণ হয়নি। প্রচুর ফাঁকা প্লট পরে আছে। খানিকটা ভিতরে গেলে রাস্তাও অপছন্দের তালিকায় যেতে সময় লাগে না। 

সেখানেই একটা বাড়ির সামনে এসে সাজু বাইক থামালো। দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলে ভিতরে যাবার অনুমতি মিলে গেল। 

ফ্ল্যাট , ফার্নিচার , আসবাবপত্র সবকিছুই নতুন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব বেশিদিন আগে তারা এখানে আসেনি। নীল রঙের ড্রেস পরিহিত যে মেয়েটা দরজা খুলে দিল সে সাজুর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো ,

- আপনি সাজু ভাই না? 

সাজু নিজেও খানিকটা অবাক হয়ে মেয়েটার কথার জবাব দিল। 

- হ্যাঁ আমি সাজু। কিন্তু আপনি আমাকে চিনেন কীভাবে? আমি তো কোনো সেলিব্রিটি নয়। 

- কে বলেছে সেলিব্রিটি নন? লেখক হিসেবে আপনি তো কতটা জনপ্রিয়। আপনার রহস্যময় গল্প গুলো আপনাকে কতটা পরিচিত করেছে আপনি জানেন না?

সাজু ভাই শুধু হাসলেন। 

মেয়েটা বললো , 

- আপনি এভাবে আমাদের বাসায় আসবেন আমি তো কল্পনা করিনি। 

- আমরা ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদের সাথে দেখা করতে এসেছি। 

- তিনি আমার মামা। 

- গুড, তিনি কি বাসায় আছেন? 

- হ্যাঁ বাসাতেই আছে , আপনারা বসেন আমি মামাকে এক্ষুনি ডেকে দিচ্ছি। 

মেয়েটা ভিতরে চলে যাবার সময় দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলো। 

- সাজু ভাই কি খাবেন আপনারা? 

- কিছু খাবো না। 

- কেন, আপনার পছন্দের ঠান্ডা কফি? 

- না৷ ম্যালা ম্যালা ধন্যবাদ। 

মেয়েটা চলে গেল , সাজু খানিকটা বিরক্ত। এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসে এরকম কারো মুখোমুখি হওয়া অস্বস্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। সাইমুন হয়তো আরো বেশি বিরক্ত হচ্ছে। 

ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদ ড্রইং রুমে এলেন। সাজু তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো , 

- রিহানুল ইসলাম সাজু। সাজু বললেই হবে। 

ডাক্তার সাহেব হাতে হাত মিলিয়ে চমকে গিয়ে হাতের দিকে তাকালেন। বিষয়টা সাজু বুঝতে পেরে নিজেই বললো , 

- আমার শরীর সবসময় এমন তাপমাত্রায় থাকে। জটিল রোগ বটে , তবে কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না। 

- ভালো করে ডাক্তার দেখান। অবশ্যই ঠিক হবে। 

- লন্ডনে চেষ্টা করেছিলাম, কোনো কাজ হয়নি তাই আর দেশের কোথাও চেষ্টা করিনি। যাইহোক, আপনার কাছে একটা জরুরি কাজে এসেছি। 

- আপনার স্ত্রী কেমন আছে? 

প্রশ্নটা সাইমুনকে করা হয়েছে।

- ওনার স্ত্রী গতকাল রাতে মারা গেছে। 

পাশ থেকে উত্তর দিল সাজু ভাই। 

- এতো তাড়াতাড়ি? আমি তো ভেবেছিলাম আর কিছুদিন বাঁচবে। রিপোর্ট তো সেরকমই ছিল। 

- তিনি ক্যান্সারে মারা যায়নি। তাকে খুন করা হয়েছে, গতকাল রাতে নুড়ি ও নুড়ির ছোটবোন নিহা এবং সাইমুন সাহেবদের বাসার দারোয়ান একসঙ্গে খুন হয়েছে। 

- অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, ও মাই গড। 

সাইমুন তখনও চুপচাপ বসে আছে। সাজুর দৃষ্টি গেল দরজার দিকে। একজোড়া চোখ সেখান থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। সাজু বুঝতে পারলো নীল ড্রেস পরা মেয়েটা ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছে। 

সাজু বললো , 

- ওনার স্ত্রীর সকল রিপোর্ট কি আপনিই দেখতেন? মানে নুড়ির যে ক্যান্সার ছিল সেটা তো আপনি দেখছিলেন। 

- হ্যাঁ আমি দেখছিলাম। কিন্তু মেয়েটা তো ক'দিন পরে এমনিতেই চলে যেতো। তাহলে তাকে খুন করার কি দরকার ছিল। আহারে। 

- ডাক্তার সাহেব, আপনারা মানুষের সেবক। দিন দিন অসংখ্য অসুস্থ মানুষের সেবা করেন। আমি আপনার কাছে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এখানে এসেছি। 

- কি কথা? বলেন! 

- নুড়ির কি সত্যি সত্যি ব্রেইন ক্যান্সার ছিল? 

হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদ। যেন এরকম অদ্ভুত কথা এ জীবনে আর কোনদিন শোনেন নাই। বললেন , 

- আপনি কি রসিকতা করছেন? 

- নাহ, আমি জানার জন্য প্রশ্ন করছি। 

- আপনাকে তো একটু আগেই বললাম যে ওনার স্ত্রীর সবকিছু রিপোর্ট আমিই দেখতাম। 

- জ্বি আমার মনে আছে। কিন্তু তবুও আমি জানতে চাচ্ছি নুড়ি সত্যি সত্যি অসুস্থ ছিল কিনা। 

- আপনি কি সব কথা বলছেন। সাইমুন সাহেব আপনি কি এজন্য আমার বাসায় দেখা করতে এসেছেন? 

- তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেছিল না তাই আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। 

- দেখুন মিঃ সাজু, আপনি এখন আসতে পারেন? আপনার এরকম উদ্ভট প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তার স্ত্রী মারা গেছে, তাকে শান্ত হতে দিন। 

- মারা যায়নি , মারা হয়েছে ,  মানে খুন করা হয়েছে। 

- তো সেখানে আমি কি করবো? আমি তো আমার রোগীকে খুন করবো না, তাই না? 

সাজু উঠে দাঁড়ালো। পকেট থেকে নিজের একটা কার্ড বের করে সেটা সামনে টেবিলের উপর রেখে সাজু ভাই বললো , 

- আমার ফোন নাম্বার ও ইমেইল এড্রেস আছে। আমি একটা তদন্তের জন্য আপনার কাছে এসেছি। আমার মনে হচ্ছে আপনার মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে পারবো। যদি কিছু বলতে চান তাহলে ২৪ ঘন্টার যেকোনো সময় কল দিবেন। 

কথাগুলো বলে সাইমুনকে নিয়ে বের হয়ে গেল সাজু ভাই। যাবার সময় আড়চোখে লক্ষ্য করলো দরজার কাছে মেয়েটা এখনো আছে। সাজু তার শেষ কথাগুলো মেয়েটার উদ্দেশ্যই বলেছে। 

বাড়ি থেকে বের হয়ে সাইমুনকে বললো , 

- সরি সাইমুন সাহেব। আপনার মানসিক বিপর্যয় চলছে তবুও এরকম হয়রান করছি। 

- আমি কি এখন যেতে পারি? 

- আমি বাইকে করে আপনাকে পৌঁছে দেবো। 

- নো থ্যাংকস , আমি বাইকে চড়তে পারি না। তখন এতটুকু আসতে অনেক কষ্ট হয়েছে। 

তবুও বাইকে করে সামনে এসে সাইমুন একটা রিকশা নিয়ে নিল। সাজু একা একা বাইক নিয়ে এগিয়ে চলছে। মোবাইলে কল আসাতে বাইকটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে কলটা রিসিভ করে। 

- হ্যালো। 

- সাজু ভাই আমি অন্তরা , একটু আগে যে ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদের বাসায় এসেছিলেন। যে মেয়ের সঙ্গে দেখা হলো সেই মেয়েটা। 

- টেবিলে কার্ড রেখে এসেছি সেখান থেকে নাম্বার নিয়ে কল করেছেন তাই না? 

- জ্বি। 

সাজু মনে মনে ভাবলো তার প্ল্যান সাকসেসফুল। যেহেতু মেয়েটা তার ভক্ত তাই সে সাজুকে সাহায্য করবে এরকম একটা ভাবনা ছিল। তাই জোরে জোরে শেষের কথাগুলো বলে এসেছিল আর নিজের কার্ড রেখে আসে। 

- হ্যাঁ অন্তরা বলো। 

- সাজু ভাই, আপনি মামার সঙ্গে নুড়ি নামের কোনো মেয়ের বিষয় কথা বলছিলেন। আমার কাছে মনে হচ্ছে মামার মুখে অস্বাভাবিক ভাবে এই নামটার একটা যোগাযোগ শুনেছি। 

- কিরকম যোগাযোগ? 

- অনেকদিন আগের কথা , তখন আমরা টঙ্গীতে থাকতাম। একদিন রাতে আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। হঠাৎ দেখি মামা ছাদে আসে। আমি কথা বন্ধ করে ছাদের সাইডে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন মামা কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছিল। 

- কি কথা বলছিল?

- বলছিল যে নুড়ি মেয়েটার রিপোর্ট এমনভাবে তৈরি করেছি মেয়েটা সত্যি সত্যি ভেবেছে তার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। আর ওই মেয়ে মেডিসিনে এমন একটা ইনজেকশন দিযেছি যেটা নিলে সে এমনিতেই শারিরীকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে। ব্রেইনে প্রচুর চাপ পড়বে তাই সহজেই ক্যান্সারের কথা বিশ্বাস করবে। 

- আপনি এখন কোথায়? 

- আমি...

এতটুকু বলার পড়ে সাজু শুনলো ওপাশে মেয়েটার কাছে আরো কেউ এসেছে। সাজু শুনতে পেল মেয়েটা কাকে যেন বলছে , 

- কে আপনি? আমার মোবাইল কেন... 

তারপরই লাইনটা কেটে গেল। সাজু সঙ্গে সঙ্গে কলব্যাক করলো কিন্তু নাম্বার বন্ধ। সম্ভবত কেউ মোবাইল কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। সাজু দ্রুত বাইক ঘুরিয়ে ডাক্তার ওবায়দুল মাসুদের বাসার দিকে রওনা দিল। 

মনে মনে ভাবলো , 

- তাহলে কি খুনি তাকে ফলো করেছে? অন্তরা নামের মেয়েটাকেও কি দারোয়ানের মতো কোনো পরিণতি উপহার দেবে? 

.

.

.

চলবে...

উনত্রিশ ফেব্রুয়ারি -- ৪